পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

বুধবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১১

প্রিয় ডিজিটাল চোর...

জাপানের ওই অধ্যাপকের হয়ে আমরা একটু ব্যাপারটা কল্পনা করি।
তিনি বাংলা ভাষাপ্রেমিক।
বাংলা শিখেছেন কষ্ট করে। বাংলা সাহিত্য, বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর অপার আগ্রহ।
লালন নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন।
গরগর করে বাংলা বলতে পারেন, বাংলা পড়তে পারেন।
সেই বাংলা ও বাঙালিপ্রেমিক জাপানি অধ্যাপক পড়ান জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তাঁর কাছে আমন্ত্রণ এসে পৌঁছাল বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সম্মেলন হবে—বঙ্গবিদ্যা সম্মেলন। তিনি নিশ্চয়ই খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন এই আমন্ত্রণ পেয়ে। তাঁর স্বপ্নের দেশ বাংলাদেশ। তাঁর স্বপ্নের মানুষেরা থাকে ওই দেশে। তারা তাঁর আগ্রহের ভাষা বাংলায় কথা বলে। এই সেই বাংলা, যে বাংলায় লালন জন্মেছিলেন। এই সেই বাংলা, যেই বাংলার পথে পথে এখনো লালনের মতো বাউলেরা একতারা হাতে গান গেয়ে বেড়ান। তিনি অবশ্যই বাংলাদেশে যাবেন।

বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি ঢাকায় আসেন। ১৯ ডিসেম্বর ২০১১। সম্মেলনের ফাঁকে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রের ক্যাফেটেরিয়ায়। সেখানে তাঁর ব্যাগটা রেখে তিনি খাবার আনতে যান। এসে দেখেন ব্যাগ নেই। নেই নেই তো নেই।
ব্যাগে ছিল দুই হাজার ডলার, এক লক্ষ ইয়েন, পঞ্চাশ হাজার টাকা, ডিজিটাল ক্যামেরা, মডেম, ল্যাপটপ, মূল্যবান কাগজপত্র আর পাসপোর্ট।
সবকিছু খোয়ান তিনি বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে এসে।
পরে তিনি সংবাদপত্রে বিবৃতি পাঠান। তিনি বলেছেন, তিনি টাকা-পয়সা কিছুই চান না। এমনকি ল্যাপটপটাও ফেরত চান না। কিন্তু ওই ল্যাপটপের হার্ডডিস্কে তার মূল্যবান কিছু তথ্য আছে। যেগুলো তিনি সারা জীবন গবেষণা করে সঞ্চয় করেছেন। ওই তথ্যগুলো কারও কিছু কাজে লাগবে না। কিন্তু ওগুলো না পাওয়া মানে তাঁর জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি শুধু ওই তথ্যগুলো ফেরত চান। তিনি কাউকে শাস্তিও দিতে চান না। শুধু তথ্যগুলো ফেরত দেওয়া হোক।
সেটা হয়তো একটা চার শ টাকা দামের পেনড্রাইভে ভরে ফেরত দেওয়া যাবে।
আমরা ওই অধ্যাপকের মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছি।
তাঁর কেমন লাগছে এখন?
বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে এসে তিনি কোন বঙ্গবিদ্যার খবর নিয়ে যাচ্ছেন?
এ ধরনের খবর পড়লে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে আসে। আমরা, পুরো জাতিই, লজ্জায় অধোবদন হয়ে পড়ি। জাপান এমন একটা দেশ, যেখানে রাস্তায় কিছু ফেলে রাখলেও কেউ নেয় না। আর এখানে এসে, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রে তাঁর ব্যাগটা খোয়া গেল?

জাপানের অধ্যাপকটি তবু একজন ব্যক্তিমানুষ। আর যে বা যারা ওই বঙ্গপ্রেমিক মানুষটির ব্যাগটা আত্মসাৎ করেছে, সে বা তারাও ব্যক্তিমানুষ। হয়তো যারা এই অপকর্ম করেছে, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও নয়। তার পরও আমাদের লজ্জা কমে না। আমরা মুখ দেখানোর কোনো একটা অজুহাতও পাই না। কাজেই আমরা আকুল আবেদন জানাই, ভাই, যার কাছে এই ল্যাপটপটা পৌঁছেছে, তিনি দয়া করুন, এক বা একাধিক পেনড্রাইভে ল্যাপটপের ফাইলগুলো কপি করে ওই জাপানির কাছে পৌঁছানোর একটা উপায় অবলম্বন করুন। পেনড্রাইভের দাম বেশি মনে হলে কুড়ি টাকার সিডিতে ভরেও তথ্য-উপাত্ত ফেরত দেওয়া যেতে পারে।
একটা ছোট্ট পেনড্রাইভে ভরে জাপানি অধ্যাপককে তাঁর গবেষণার ফাইলগুলো ফেরত দিলে হয়তো আমাদের লজ্জা খানিকটা কমবে।
যেমন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্র হত্যার সঙ্গে জড়িতদের গ্রামবাসী পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে। এমনকি একজনকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন তার বাবা। ওই ঘটনাও খুব লজ্জার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা নৌভ্রমণে বেরুবে, তাদের সঙ্গে মেয়ে, কাজেই ওই মেয়েদের তুলে নিয়ে যেতে হবে—এই চিন্তা মাথায় আসে কী করে, আমাদের ভাবতেই হয়। আর একটা নতুন মোবাইল ফোনের লোভে নৌকার মাঝি মাঝপথে নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করে ভাসতে লাগল, সেটাও জানার পর আমাদের মনটা খুব দমে যায়। তার পরও যখন গ্রামবাসী তাঁদের গ্রামের ছেলেদের বা একজন বাবা তাঁর নিজের সন্তানকে পুলিশের হাতে তুলে দেন, আমাদের ক্ষতে সামান্য প্রলেপ পড়ে। 
তেমনি করে ওই জাপানি ভদ্রলোক যদি তাঁর সারা জীবনের পরিশ্রমের ফসল গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো ফেরত পান, আমাদের লজ্জার আগুনে হয়তো সামান্য পানি পড়বে।
কিন্তু ভাবছি, যখন বিশ্বব্যাংক আমাদের মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করে, আর ওই মন্ত্রীকে কেবল বদলি করা হয়, আর ওই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরকারের উচ্চতম অবস্থান থেকে সাফাই গাওয়া হয়, তখন আমাদের লজ্জার আগুনে তো পানি পড়ে না, বরং কেরোসিন পড়ে।
একটা পেনড্রাইভে করে জাপানি গবেষকের তথ্য তাঁর কাছে ফেরত দেওয়া গেলে আমাদের লজ্জা খানিকটা কমে। কিন্তু আমাদের জাতীয় লজ্জা কোন পেনড্রাইভে ভরে আমরা জমা দেব?
জাপানি ওই অধ্যাপকের কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলি, আপনি যদি বাংলাদেশের প্রবাদ-প্রবচন বাগ্ধারাগুলো নিয়ে গবেষণা করেন, তাহলে আপনি বঙ্গবিদ্যা সম্পর্কে বহু কিছু জানতেন।
এই দেশের বাগ্ধারা হলো, চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড়ে ধরা। এই দেশের বাগ্ধারা হলো, চোরের মার বড় গলা। আপনি নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথের লেখার ভীষণ ভক্ত। তিনি বলেছেন, ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’ আর আপনার আগ্রহের অন্যতম বিষয় যে লালন তিনি বলেছেন, ‘মন সহজে কি সই হবা, চিরদিন ইচ্ছা মনে আল ডিঙায়ে ঘাস খাবা।’ এই দেশের প্রবাদ হলো, ‘চোরের দশ দিন, সাধুর এক দিন।’
আমরা কেবল চোরের দশ দিন দেখে যাচ্ছি, সাধুর এক দিন এই দেশে আসছে না। এই দেশের বাগ্ধারা হলো, ‘পুকুরচুরি’। এই দেশে কেবল পুকুরচুরি হয় না; সমুদ্রচুরি, সেতুচুরি, নদীচুরিও হয়।
তবে আশার কথা হলো, আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলছি। আপনার চুরিটাকে আমরা বলতে পারি, ডিজিটাল চুরি। আপনার ওই ডিজিটাল চোরের প্রতি আমাদের আকুল আবেদন, হে ডিজিটাল চোর, তুমি সব চুরি করো, কিন্তু বাংলাদেশের মান-সম্মান ভাবমূর্তি চুরি কোরো না। দয়া করে তুমি জাপানি ভদ্রলোকের মূল্যবান গবেষণা তথ্য ফেরত দাও।
একই কথা হয়তো আমাদের সেতু বা নদীবিষয়ক ভাবমূর্তি অপহারকদেরও বলতে পারতাম। কিন্তু ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী।’

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক 

সূত্রঃ প্রথম আলো, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন