পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১১

দীপু মনি সেদিন ওভাবে কেটে পড়েছিলেন কেন!

আমীন কাদীর
ডা. দীপু মনি অনেক কিছুই হতে পারতেন। যেহেতু মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়েছেন, ডাক্তার শব্দটি নামের সঙ্গে জুড়ে নিয়েছেন। তিনি অবশ্যই দক্ষ একজন চিকিত্সক হতে পারতেন। মেডিকেলের যে কোনো ডিসিপ্লিনে বড় ডিগ্রি নিয়ে তিনি আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারতেন।

ডা. দীপু মনি চাঁদপুরের এক সম্ভ্রান্ত রাজনৈতিক পরিবারের সম্ভাবনাময় সন্তান। ছোটবেলাতেই রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় হাতেখড়ি। তার বাবা বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য কর্মী। আওয়ামী লীগ এই পরিবারের রক্তে। রাজনীতি শিরায়-শোণিতে। দীপু মনি ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগকে ছায়াসঙ্গী করে বড় হয়েছেন। মিছিল-বিক্ষোভ লড়াই-সংগ্রাম করেছেন ত্যাগী আওয়ামী লী
গ কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।
২১ আগস্টের নিষ্ঠুর ট্র্যাজেডিতে আইভী রহমানের অকাল প্রয়াণের পর মহিলা আওয়ামী লীগের কর্ণধার হন দীপু মনি। সভানেত্রীর মর্যাদাপূর্ণ পদটি পেয়ে যান রাতারাতি। তার সামনে চলার অনেক পথ ছিল বাকি। দীর্ঘদিন ধরে সেবা ও নেতৃত্ব দিতে পারতেন মহিলা আওয়ামী লীগকে। সেই পথ ধরে তার কাছে আওয়ামী লীগের রাজনীতিও পেতে পারত অনেক অনেক সেবা।

তিনি হতে পারতেন অনেক কিছু। মহাজোটের নবীন মন্ত্রী হওয়ার গোড়াতে আমরা জেনেছি জনস্বাস্থ্য নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন। বিদেশে গিয়ে পড়াশোনাও করেছেন। পাবলিক হেলথ বিষয়ে দক্ষ হওয়ার চেষ্টা করেছেন।

হ্যাঁ, তিনি অবশ্যই একজন দক্ষ পাবলিক হেলথ একটিভিস্টও হতে পারতেন। মেধাবী নারী। মেধাবিকাশের নানা ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্মান অর্জনের দারুণ সম্ভাবনা ছিল তার মধ্যে।
তার ‘যোগ্যতা বৃত্তান্ত’ পড়তে গিয়ে আমরা জেনেছি—বৈদেশিক সম্পর্ক শাস্ত্র নিয়ে বেশকিছু বইপত্র তিনি পড়েছেন। গবেষণাতেও সচেষ্ট হয়েছেন।

নিঃসন্দেহে দক্ষ জানাশোনাঅলা আমলা হতে পারতেন তিনি। ডা. দীপু মনির একজন ভক্ত শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে নিসঙ্কোচে বলি—সদা স্মিত হাসি সুদর্শনা স্মার্ট এই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারীর নানা কিছু হওয়ার সম্ভাবনার মাত্র কয়েকটি দিক কেবল বললাম। চাইলে আরও অনেক সম্ভাবনার কথা বলা যায়। কিন্তু ভক্ত-গুণমুগ্ধ হিসেবে আমরা যে এখন বিভ্রমেই পড়েছি।

কতকিছু তিনি হতে পারতেন; তার সামনে উজ্জ্বল-সমুজ্জ্বল কত পথই যে ছিল খোলা। তিনি হতে পারতেন রাজনৈতিক ময়দানের বীর, তিনি হতে পারতেন অনেক কিছু। 

কিন্তু হা-হতোস্মি। সব প্রত্যাশায় জলাঞ্জলি দিয়ে ডা. দীপু মনি হতে পারেননি কিছুই।
না হতে পারলেন একজন প্রথিতযশা জনসেবক চিকিত্সক; না হতে পারলেন আইভী রহমানের যোগ্য উত্তরসূরি রাজনীতিক; হতে পারেননি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ-গবেষক-শিক্ষক; হওয়া হলো না রাষ্ট্র-ক্যাডারের দক্ষ আমলা। চাঁদপুরের মেধাবী-উজ্জ্বল মুখ দীপু মনি, আমরা যেভাবে প্রত্যাশায় বুক ভরা স্বপ্ন দেখেছিলাম সেটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দীপুর হওয়া হয়নি কিছুই।

ডা. দীপু মনির কাছে করজোড়ে কলম-কবুল করে ক্ষমা চেয়েই বলছি—তিনি হতে পারতেন; কিন্তু হননি কিংবা হতে পারেননি। আরও পরিষ্কার করে বলা যায়—দীপু মনি সম্ভবত হতে চানওনি। 
প্রিয় পাঠক, আপনারা সবাই হয়তো আমাকে পাগল ঠাউরে বসেছেন। কি বলছে এই মূর্খ নিবন্ধ লিখিয়ে। কার সেই সাহস! কে বলবে ডা. দীপু মনি কিছু হননি! কিংবা হতে পারেননি। তিনি তো অনেক কিছুই হয়েছেন। দেশে এমন কে মূর্খ রয়েছে—যে জানে না, ডা. দীপু মনি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। কেবলই কি অত নম্বর পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশের তো বটেই উপমহাদেশের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন।

মহাজোট মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়ে ডা. দীপু মনি নামে একজন উজির আছেন বটে। কিন্তু তিনি কি আদৌ একটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে উঠতে পেরেছেন? বিবেকের দ্বিধা থরো থরো বুকে হাত দিয়ে বলুন—তাকে আদৌ একটি সার্বভৌম স্বাধীন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলা যায় কি!
আমাদের প্রতিবেশী বহুল আলোচিত দেশ ভারতেরও একজন বিদেশ/পররাষ্ট্রমন্ত্রী রয়েছেন। তার নাম এসএম কৃষ্ণা।

ইতিহাসের ব্যাপক ঘাঁটাঘাঁটির প্রয়োজন দেখছি না; একেবারে সর্বসাম্প্রতিক দৃষ্টান্তের কথাই যদি বলি; এসএম কৃষ্ণাকে আমরা বিদেশবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে আলোক-উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখেছি। যদি আমাদের উদার-মাহাত্ম্যপূর্ণ বিনয় বিনম্র পরিপ্রেক্ষিতেই বলি—কি এমন হয়েছিল আমেরিকার জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে? তিলকে অমন তাল করার ভয়ঙ্কর কিছু কি আসলেই ঘটেছিল! অমন কাণ্ড তো মার্কিনিরা হামেশাই ঘটাতে অভ্যস্ত!

আবুল পাকির জয়নুল আবেদীন আবদুল কালাম—এপিজে আবদুল কালাম যদি সিটিং ভারত প্রেসিডেন্ট হতেন, তবুও না হয় মর্যাদা বা মর্যাদাহানির কথা ছিল! তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি। তাও আবার কংগ্রেস দল ও সরকারের ঘোর শত্রু বিজেপি জমানার বিজেপীয় রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন তিনি। তিনি মুসলমান। মার্কিনিরা দুনিয়াজুড়ে যুদ্ধে নেমেছে মুসলমান জঙ্গিদের বিরুদ্ধে। বিমানবন্দরের যারা প্রতিরক্ষা রক্ষী। তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে—কেমন করে ইসলামী জঙ্গিদের হাতেনাতে পাকড়াও করতে হবে। কোনো অপরাধের পর গোয়েন্দাদের কাছে যেমন সংশ্লিষ্ট সবাই সন্দেহভাজন ক্রিমিনাল। মার্কিনিরা সেই থিওরি অনুযায়ী চলছে।

আরবি বা মুসলমান নাম হলেই হলো। ব্যাটা অতিঅবশ্যি সন্দেহভাজন মুসলিম জঙ্গি হবে নিশ্চয়ই। তা লোকটা বয়োবৃদ্ধ কিনা; মুসল্লি-মুরব্বি কিনা; কোনো দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি কিনা—সে বিবেচনার সুযোগ কোথায়। কারও চেহারায় তো রাষ্ট্রপতি সিল মারা থাকে না। পাসপোর্টেও সাবেক রাষ্ট্রপতি উল্লেখ থাকে না। কিন্তু নামে মুসলমান পরিচয়টা ষোলআনাই থাকে। সেজন্যই এপিজে কালামকে হেনস্তা-হয়রানি।
এমন বিবেচনায়, বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান অতিউদার বিনম্র কূটনীতির নৈতিকতায় এই হেনস্তা-লাঞ্ছনা কোনো দোষণীয় কাজ নয়। এটা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। বরং কালামকেই দোষী সাব্যস্ত করা যেতে পারে। তিনি জ্ঞানী মানুষ। মার্কিন আচারবিধি, জঙ্গি সংক্রান্ত বিমানবান্দরিক শিষ্টাচার তার জানা—তারই উচিত ছিল মার্কিনিদের আশ্বস্ত করা, নামটা মুসলমান হলেও তিনি জঙ্গিটঙ্গি নন। যদি সেটা আগাম কবুল করে তিনি মার্কিন মুল্লুকে যেতেন—নাহ্ মার্কিন বিমানবন্দর রক্ষীদের অবশ্যই বিশ্বাস করা যেতে পারে, তারা কালামকে হেনস্তা করতেন না; হেনস্তা করার লোকই তারা নয়।

কিন্তু সাবেক বিজেপি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির গায়ে লাঞ্ছনার টোকা দিতেই চির বৈরী কংগ্রেস সরকারের বিদেশ মন্ত্রক দফতরকে আমরা কোন ভূমিকায় দেখলাম! বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির চলতি দাবার ছকে আমেরিকা ভারতের দুশমন দেশ নয়। বরং দোস্তী সম্পর্কের চূড়ান্ত দহরম-মহরম চলছে। গলায় গলায় বন্ধু। বিদেশ বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণা কি এই দোস্তির কথা জানেন না? তিনি মহাজোট উজিরেআলাদের মতো অপরাহ্ন অব্দি ঘুমিয়ে দিন কাটান! তিনি কি বিজেপি-কংগ্রেস বৈরী রাজনীতির ধার ধারেন না! তিনি অমন গর্জে উঠলেন কেন? কেন সরোষে ওয়াশিংটনে মার্কিন সদর দফতরে ভারত হাইকমিশনারকে আগ বাড়িয়ে ঠেলে পাঠালেন? দিল্লিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করলেন! সাফ জানিয়ে দিলেন—খুব বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই এই আচরণ সহ্য করা হবে না। মার্কিন মুল্লুকে যেমনটা হয়েছে—সময় আসুক, ভারত মুল্লুকে পাল্টাপাল্টি হবে। ছাড় দেয়া হবে না। 

গর্জনে-ধমকে কাজ হলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমা চাইতে বাধ্য হলো। নাকে খত দিলো—এমনটা আর হবে না।
হ্যাঁ, এসএম কৃষ্ণাকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানি। মানতে আমরা বাধ্য। তার কর্তব্য বোধ, আচরণ মানতে বাধ্য করেছে আমাদের। একজন বিদেশমন্ত্রীর কী দায়দায়িত্ব, আচার-আচরণ স্টাইল হবে এটা জানতে-শিখতে গবেষণাকর্মী হওয়ার দরকার নেই।

এসএম কৃষ্ণাকে যদি আমরা তার নিজ দেশ, নিজ পতাকার গৌরবের অংশীদার কর্মতত্পর বিদেশমন্ত্রী বলি; তাহলে কোন মুখে বলব ডা. দীপু মনি একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী? পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অর্থ যদি হয় নিজ দেশের স্বার্থ, মর্যাদা সম্মানের সংরক্ষক পররাষ্ট্র বিষয়কমন্ত্রী, তাহলে কি দীপু মনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন বলা যায়! আর যদি অর্থ এমন হয়—পররাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষক মন্ত্রী, তা হলে হয়তো অর্থের ব্যত্যয় ঘটে না।
ডা. দীপু মনি বেয়াদবি নেবেন না। সবিনয়ে বিনম্র চিত্তে কথাগুলো বলছি। অনুগ্রহ করে একটু ভেবে দেখবেন। আশা করি, শালীনতার কোনোরকম বিপর্যয় এখানে ঘটছে না।

২৪ নভেম্বর ব্রিফিং-এ ডা. দীপু মনি শালীনতা বজায় রেখে লেখার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাকে অজস্র ধন্যবাদ, তিনি হুমকি-ধামকি দেননি। ভয়ঙ্কর ভয় দেখাননি মামলা হামলার। তার ভাষায়, সবিনয়ে বিনম্রভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন। তার কণ্ঠ ছিল কোমল, আন্তরিক। সত্যিকারের বিনয়ের ছোঁয়া ছিল তাতে। অন্য মন্ত্রীদের কণ্ঠে বিনয়ের কথা শুনলে আমরা ভীষণ ভয় পাই; তাদের কণ্ঠে থাকে দর্প; আক্রমণ হামলার দম্ভ—দীপুর কণ্ঠে তার লেশমাত্র ছিল না। আর ঠিক সেজন্যই আমার লেখায় যদি তিনি কোথাও কষ্ট পান আমি আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

প্রশ্ন হলো মহাজোট সরকারের সবচেয়ে বিনম্র পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের শালীনতার মাত্রাবোধের কথা স্মরণ করিয়ে কেন দিলেন! সাংবাদিকরা তাদের লেখায়- টিভি ভাষ্যে কষ্ট দিয়েছেন কি মন্ত্রীকে! অশালীনতার কি সেই অভিযোগ? নিশ্চয়ই ভুল হচ্ছে না আমাদের বুঝতে। শালীনতার অভিযোগের ঠিক আগের দিন ২৩ নভেম্বর, সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন ডা. দীপু মনি ও পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস। খুবই সঙ্গত এবং স্বাভাবিক—এদিন টিপাইমুখ বাঁধ প্রসঙ্গ উঠেছিল। টিপাই বাঁধ যেখানে বাংলাদেশের ভূ-প্রতিবেশগত অস্তিত্বের জন্য ভয়ঙ্কর হুমকি, পানি-সার্বভৌমত্বের লংঘন। সেজন্য সাংবাদিকদের প্রশ্ন বেশ খানিকটা অস্বস্তির ও অপ্রীতিকর হয়ে উঠেছিল।

টিপাইমুখে প্রস্তাবিত বাঁধ নির্মাণ নিয়ে সিলেট বিভাগসহ সন্নিহিত ১০-১২টি জেলায় কোটি মানুষ দলমত নির্বিশেষে রাজনীতির ঊর্ধ্বে জেগে উঠেছেন। ভয়ঙ্কর বিশাল মাইন-ডিনামাইট টিপাই-ড্যাম নিয়ে সারা দেশের মানুষ আতঙ্কিত। ভয় মরুভূমিকরণের; ভয় পানি প্রবাহ বন্ধের; ভয় লাখ লাখ হেক্টর জমিতে ফসল হানির; ভয় মত্স্য জীববৈচিত্র্য হানির। আরও বড় ভয়—প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের। এসব ভয়ের কথা শুধু বিএনপি বলছে না। এসব ভয়ের কথা খালেদা জিয়া একা বলছেন না। এই প্রবল আতঙ্কের কথা কয়েক বছর ধরেই ভারত ও বাংলাদেশের পরিবেশবিদরা বলছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন; ভূ-বিজ্ঞানীরা ডাটাসহ জানাচ্ছেন।

বরাক আন্তর্জাতিক নদ। প্রতিবেশী দু’দেশের হিস্যা এই নদে। বাঁধ হচ্ছে আন্তর্জাতিক জলসম্পদে। পরিবেশ আইনবিদরা বলছেন—এই বাঁধ জাতিসংঘের ৯টি সর্বসম্মত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে হচ্ছে।
এসব বলে মুখে ফেনা তুলছেন পরিবেশবিদরা। অথচ আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রক বলছিল, তাদের কিছু জানা নেই। ভারত কিছু জানায়নি। পানিসম্পদ মন্ত্রী বলছেন, তিনি কিছু জানেন না। পানিসম্পদ পাতিমন্ত্রী বলছেন, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ বিষয়ে তাদের নাক গলানোর কিছু নেই। বেচারা পাতিমন্ত্রীর বাড়ি বৃহত্তর বরিশালে। সাত নদীর মোহনায়, সাগরের কাছে অফুরন্ত জলরাশির মাঝেই থাকেন। হোক লবণাক্ত, কিন্তু তার এলাকায় পানির অভাব নেই। জলাভাবের কল্পনাও করার ক্ষমতা তার রহিত। টিপাইমুখ যদি বিপর্যয়ের জাহাজ হয়, তিনি নিতান্তই আদার বেপারি।
সিলেট জেলার মানুষ আতঙ্কে মরছে; আর মন্ত্রী-আমলারা আছেন প্রতিশ্রুতি, আস্থা বিশ্বাসের স্বস্তিসুখের উল্লাসে।

এমন অবস্থায় সাংবাদিকদের প্রশ্ন অসোয়াস্তিকর হবেই, তা-ই হলো।
সাংবাদিকরা বিস্তর সওয়াল করলেন। মন্ত্রী কিংবা সচিবের মুখে যেন কুলুপ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্মিত হাসিতে কথা বলেন সব সময়। মিজারুল কায়েস মিজারেবললি ইন ডেনজার। আজ দু’জনার কারও মুখেই হাসি নেই। যেন হাসতে তাদের মানা। সচিব অবশ্য মুখ ফুটে ২/১টা কথা বললেন। তাতে প্রাণ নেই। যেন তোতা পাখিকে শেখানো বুলি। সে কথা সবার জানা এবং অনেকবার শোনা। তিনি বললেন, টিপাই মুখ ইস্যুতে আশ্বাস দিয়েছে ভারত। সেই আশ্বাসে বড় আস্থাশীল তারা। আবার সেই মিজারুলই বললেন, ভারতের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। ভারত এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর দেয়নি।
কী অদ্ভূত বৈপরীত্য মিজারুলের কথায়। কী নিঃশর্ত আস্থা, ঈমান, বিশ্বাস মিজারুলের। যে দেশটি মুখ ফুটেই কথা বলে না, পাত্তাতেই নেয় না তাদের ক্ষীণ আওয়াজকে। তাদের ব্যাপারে আস্থা-বিশ্বাসের কোনো ঘাটতি নেই।

সে যাক, অর্বাচীন সাংবাদিকরা মূর্খতার বশে জানতে চাইবেনই যে ভারত তথ্য দেয় না; জবাব দেয় না—সেই দেশটির প্রতি সরকারের কিসের এত আস্থা!
খুবই অশালীন হয়েছে কি প্রশ্নটি! হ্যাঁ, তা তো বটেই। চাঁছাছোলা প্রশ্ন। কোনো রকম রাখঢাক নেই।
বোকাদের এই গ্রাম্য-আনস্মার্ট প্রশ্নে কোনো জবাব দেননি সচিব মহোদয়।
নাছোড়বান্দারা কি ছাড়ে! তাদের একের পর এক প্রশ্ন। টিপাই মুখ নিয়ে কেমন করে আপনারা শতভাগ শঙ্কামুক্ত। ভারত আপনাদের না জানিয়ে, রীতিমত অন্ধকারে রেখে চুক্তি পর্যন্ত করে ফেলেছে—তাদের ব্যাপারে কেমন করে পূর্ণ আস্থাশীল!
মিজারুলের এবার জবাব—আমাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। কী জ্ঞান ঝলসানো উত্তর!
টিপাই মুখ বাস্তবায়ন বাংলাদেশ চায় কিনা—মিজারুল বললেন, এই ধরনের প্রশ্নের আমি উত্তর দিতে পারি না।
সরকারের পররাষ্ট্র দফতরের শীর্ষতম আমলা জবাব দিতে অপারগ। কে দেবেন তবে উত্তর। উত্তরের জন্য কার কাছে তবে ছুটবেন উত্সুক সাংবাদিক।
ভারত যে চুক্তি করল, আপনারা কখন তা জানলেন! মাননীয় সচিবের উত্তর—এ ব্যাপারে আমাকে খোঁজ নিতে হবে।
দিল্লির হাই প্রোফাইল কিংবা কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশন কিছু জানিয়েছে কিনা? কী আস্পর্ধাপূর্ণ প্রশ্ন! পররাষ্ট্র মন্ত্রকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ! সচিব ধৈর্য্য ধরেই বললেন, তারা কিছু জানিয়েছে কিনা তা দেখতে হবে।
যে যাই বলুক, মিজারুল কায়েস বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের মুখ্য নির্বাহী বড় কর্তা! খালি চোখে দেখা যাচ্ছে—বড় কর্তা তার ঘরের খবর কিছুই জানেন না। সাংবাদিক প্রশ্ন দাখিল করেছে—এবার তিনি দাফতরিক অফিস অর্ডার প্রজ্ঞাপন জারি করে উত্তর জানতে চাইবেন।
অবশ্য মিজারুলকে তেমন কোনো দোষ দেয়া যায় না। কতটাই বা; কিইবা তিনি বলতে পারতেন! কি-ইবা তিনি বলবেন! তিনিও তো বাংলাদেশের বাঙালি। নিশ্চয়ই তার দেশপ্রেমিক বিবেক অবিরাম দংশন করে চলছিল। কিন্তু তার যে বলার মুখ ছিল না। তাই সাংবাদিকদের প্রশ্নে আর বিবেকের দংশনে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে তিনি অবশেষে বললেন, এসব প্রশ্ন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য তোলা থাক। তিনি এসবের জবাব দেবেন।
বোঝা গেল—এবারও তিনি ঝানু কূটকৌশল করলেন। তিনি তো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দেশপ্রেমিক আমলা। মহাজোট সরকারের চাকুরে নন। মহাজোট মন্ত্রীর দায় কেন তিনি কাঁধে তুলে নেবেন।
কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তখন আমরা কোথায় পাই। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে তার ব্যক্তিত্বশালী মুখটি এক ঝলক দেখা গিয়েছিল বুঝি। তারপর কোথায় তিনি! সংবাদ সম্মেলনে টিপাই মুখ বাঁধ নিয়ে বাঁধভাঙা প্রশ্ন আসবেই—সেই ভয়ে কি আগেভাগে সটকে পড়লেন।
হ্যাঁ ঠিক তাই, সংবাদ সম্মেলন শুরু হতে না হতেই মহাব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে দ্রুত সরে পড়েন তিনি। কি তার এমন মহাব্যস্ততা।
২৪ নভেম্বরের কাগজে পত্রিকাঅলারা একটু বাড়াবাড়িই লিখেছে দেখলাম। তারা বলল, পররাষ্ট্র সচিবকে তোপের মুখে রেখে প্রশ্ন এড়িয়ে কেটে পড়লেন দীপু মনি। কেউ লিখল—সরে পড়লেন, সটকে পড়লেন। এসব কী ধরনের ভাষা! কেটে পড়া, সটকে পড়া শালীন ভাষা হতে পারে না। দীপু মনি সে কথাই বললেন পরদিন।না তিনি পালিয়ে আমাজন বা আফ্রিকার জঙ্গলে যাননি। দেশেই ছিলেন। ২৪ নভেম্বর ব্রিফিং করে অতি বিনয়ের সঙ্গে প্রতিবেদন লেখার সময় শালীনতা বজায় রাখার একান্ত অনুরোধ জানালেন।
এদিন টিপাইমুখ নিয়ে কিছু বলতেই মিডিয়ার সামনে আসা। কী বললেন তিনি, বললেন সেই পুরনো গত্বাঁধা সংলাপ। ‘ভারতের আশ্বাসে আমরা পূর্ণ আস্থাশীল। টিপাই মুখ চুক্তি সরকারের নজরে এসেছে।’
বললেন—ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। জানতে চেয়েছি। আমরা মনে করি, যৌথ জরিপ দরকার। আমরা উদ্বেগ জানিয়েছি। ভারত আশ্বস্ত করেছে—কোনো ক্ষতি তারা করবে না।
দীপু মনি তার সমৃদ্ধ কূটনৈতিক জ্ঞানও আমলে আনলেন। বললেন, আমরা ভারতের উপর আস্থাশীল, কূটনৈতিক রীতি অনুযায়ী আস্থাশীল হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আশ্চর্য জ্ঞান, আশ্চর্য উপলব্ধি। এটা কি কূটনৈতিক সহনশীলতা, নাকি পররাষ্ট্রিক আনুগত্য!
কেউ একজন দখলদার আমার কোনো ক্ষতি করবে না—আশ্বাস দিয়ে দখল করছে আমার বাড়ি, আমি তা দেখেই যাব, কিছু বলব না। শুধু আস্থা পোষণ করব, বিশ্বাস করব, সে যে আমার বাড়ি দখল করছে, নিশ্চয়ই তার কোনো মহত্ উদ্দেশ্য আছে। নিশ্চয়ই আমার ভালোর জন্য দখল করছে আমার ৪২ নদী। আমার সীমান্ত জমি। নিশ্চয়ই আমার ভালোর জন্য দখল করছে আমার তালপট্টি, আমার সমুদ্র সম্পদ। যদি কোনোদিন আমার দেশ-এর ওপর হাত বাড়ায়; নিশ্চয় তাও হবে আমার অপরিসীম ভালোর জন্য। যদি আমার দেশের চারদিকে বাঁধ দিয়ে আমাকে একবার পানিতে চুবিয়ে মারে—আবার শুকনা মৌসুমে খরায় পুড়িয়ে মারে—সেও আমার একান্ত ভালোর জন্য!
সত্যি ভারতের অসীম সৌভাগ্য। তার ক্ষুদ্র প্রতিবেশী বাংলাদেশে তারা অপরিসীম ভালো একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেয়েছে। যদি সর্বস্বত্ব কেড়ে নেয়া হয়—এই মানুষটি ভাববে, কাজটি তার ভালোর জন্যই করা হচ্ছে।
আমি যারপরনাই দুঃখিত—জানি না শালীনতার সব শর্ত পূরণ করে এই লেখাটা লিখতে পারছি কিনা, কিন্তু কলম নামের এই বিবেক যে আপনগতিতে স্বচ্ছতোয়া নদীর মতো ছুটছে—তাকে আমি কেমন করে শালীনতার লাল কাপড় দেখাব।
যৌথ জরিপের কথা বললেন দীপু মনি। উদ্বেগ জানিয়েছেন তাও বললেন, আবার একই মুখে একই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলছেন, টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদ করছে, তারা জাতীয় স্বার্থে করছে না। করছে সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে। তারা উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
হঠাত্ কেন দীপু মনি প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠলেন। দীপু বললেন—‘জলবিদ্যুত্ প্রকল্পের জন্য নেপালে ৩২৭ মিটার উঁচু বাঁধ হচ্ছে। এটা নিয়ে কোনো প্রতিবাদ হচ্ছে না। অথচ টিপাই মুখ বাঁধের উচ্চতা হবে মাত্র ১৬২ দশমিক ৮ মিটার। আর তা নিয়েই যতসব হৈচৈ হচ্ছে।’
দীপু দিদিমনি, এটা আপনি কী বললেন! আপনার এই কথায় আমরা পরিষ্কার মেসেজ পাচ্ছি—টিপাই বাঁধ নিয়ে আমাদের উদ্বেগের কিছু নেই। যদি কারও উদ্বেগ হয়, তা যাচ্ছেতাই ব্যাপার। ৩২৭ মিটার বাঁধের তুলনায় ১৬৩ মিটার বাঁধ অতি তুচ্ছ ব্যাপার। বাংলাদেশের কী আসে-যায় তাতে।
মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়ে শালীনতার সঙ্গে বলি—দীপু মনি আপনি একজন ভালো পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারতেন। সেই সুবর্ণ সুযোগ আপনার সামনে ষোলআনাই ছিল। এজন্য গবেষণা-বিস্তর লাইব্রেরি ওয়ার্কের দরকার নেই—শুধু সংজ্ঞাটা সঠিকভাবে জানা ও অনুধাবনই যথেষ্ট ছিল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানে বাংলাদেশের স্বার্থের একশ’ শতাংশ সংরক্ষক, ধারকবাহক হয়ে পররাষ্ট্র—অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সুরক্ষার মন্ত্রী; বাংলাদেশকে পররাষ্ট্র বিবেচনা করে অন্য দেশের স্বার্থ সংরক্ষক মন্ত্রী নন। তিনি কেবল বিনয় বিগলিত হবেন না। দেশের দরকারে কঠোর মূর্তিও হবেন। ডা. দীপু মনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন; কিন্তু আদৌ তিনি তা হতে পারেননি। অনেক কিছুই পারতেন তিনি; কিন্তু তার কিছুই হওয়া হলো না।
লেখক : কপি সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ; ব্লগার
ameenqudir@gmail.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন