পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১১

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষ নিয়ে রিপোর্ট : পাত্তা দেননি ‘রুই-কাতলা’রা, উদ্দেশ্যেও গলদ

তত্ত্বাবধায়ক নামের অবৈধ সরকারের সময় ২০০৭ সালের ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে গঠিত সংসদীয় উপকমিটি তার রিপোর্ট তৈরি করেছে। বহুদিন ধরে ঢাকঢোল পিটিয়ে আসার পর ৮ ডিসেম্বর উপকমিটির আহ্বায়ক রাশেদ খান মেনন জানিয়েছেন, প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার রিপোর্টটি ২১ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির কাছে জমা দেয়া হবে। ওই কমিটি জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে রিপোর্টটি উপস্থাপন করবে। চোটপাট দেখিয়ে মিস্টার মেনন বলেছেন, তারা কোনো ‘চুনোপুঁটি’কে ধরেননি, যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদেরকেই আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়ার সুপারিশ করেছেন। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে এবং সিন্ডিকেটের অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসে যাতে সেনা ক্যাম্প স্থাপন না করা যায় সে জন্য ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে উপকমিটি। রিপোর্টে ১১টি পর্যবেক্ষণ এবং ১৩ সুপারিশ রয়েছে।

রিপোর্ট নিয়ে আরও অনেক কথাই বলেছেন রাশেদ খান মেনন। কিন্তু সব মিলিয়ে তিনি কোনো আস্থা তৈরি করতে পারেননি। এর একটি কারণ হলো, প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমদকে সামনে রেখে জেনারেল মইন উ’র নেতৃত্বাধীন যে গোষ্ঠীটি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল তাদের ব্যাপারে সহজবোধ্য কারণেই আওয়ামী লীগ সরকারকে কখনও উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষের কথাটাই ধরা যাক। তদন্ত কমিটি গঠন করতেই সরকারের লেগেছে ১৯ মাসের বেশি। উপকমিটি গঠিত হয়েছিল গত বছরের আগস্টে। উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় বিষয়টিও খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। ‘চুনোপুঁটি’কে ধরেননি বলে চোটপাট করা হলেও উপকমিটি কিন্তু কোনো ‘রুই-কাতলা’কেও তলব করে হাজির করতে পারেনি। ‘রুই-কাতলা’রা পাত্তাই দেননি। দুই প্রধানজনের মধ্যে জেনারেল (অব.) মইন উ আহমেদ ‘ডিজিটাল’ পদ্ধতিতে টেলি কনফারেন্সের মাধ্যমে মেনন সাহেবদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। ‘অনভিপ্রেত’ সে ঘটনার জন্য দুঃখও নাকি প্রকাশ করেছেন তিনি। অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমদ সেটুকু সৌজন্য দেখানোরও প্রয়োজনবোধ করেননি। তিনি তার বক্তব্য পাঠিয়েছেন ই-মেইলযোগে। উপকমিটি একে পূর্ণাঙ্গ মনে করেনি কিন্তু এজন্য ফখরুদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে পাল্টা কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি অর্থাত্ নিতে পারেনি। ডিজিএফআই’র দুই প্রধানের পাশাপাশি পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদের ব্যাপারেও একই কথাই সত্য। এই ‘রুই-কাতলা’রা বিদেশে বহাল তবিয়তে বসবাস করছেন, আইজি নূর মোহাম্মদকে তো সরকার রাষ্ট্রদূতের চাকরি দিয়ে উল্টো পুরস্কৃতও করেছে। 

এসব কারণেই তদন্ত রিপোর্টের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এর ভিত্তিতে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করছে না। এর পেছনে উপকমিটিও যথেষ্টই অবদান রেখেছে। কারণ, প্রথমে ‘ফৌজদারি দণ্ডবিধি’ অনুযায়ী শাস্তির সুপারিশ করলেও প্রশ্নসাপেক্ষ কারণে উপকমিটি শব্দ দুটি পরিবর্তন করে ‘প্রচলিত আইন’ জুড়ে দিয়েছে। অর্থাত্ কখনও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হলেও মামলা চলতে থাকবে বছরের পর বছর ধরে। ততদিনে উদ্দিন সাহেবরা দুনিয়া থেকেই বিদায় নেবেন। এর মধ্য দিয়েও পরিষ্কার হয়েছে, গলদ রয়েছে উদ্দেশ্যের মধ্যেই। তাছাড়া শেয়ারবাজার নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি এবং তার রিপোর্টের কথাও স্মরণ করা দরকার। এক লাখ কোটি টাকা লুণ্ঠন করে নেয়ার এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা সর্বস্ব খুইয়ে পথে পড়ে যাওয়ার পরও সরকার দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দায়ীদের নাম ‘ডিলিট’ তো করা হয়েছেই, এমনকি তদন্ত রিপোর্টকেও ধামাচাপা দিয়েছেন ক্ষমতাসীনরা। এর কারণ, অর্থমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, জড়িতদের নাম প্রকাশ করা হলে সরকার বেকায়দায় পড়তে পারে। অর্থাত্ থুতুটা নিজেদের বুকেই এসে পড়বে!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষের ব্যাপারেও একই কথা সত্য। দৃশ্যপটে কারা ছিল, সেটা বিবেচ্য হলেও বড় কথা হলো, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার ঠিক সেই বিশেষজনদের বিরুদ্ধে যার বা যাদের হুকুমে ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিদের ইচ্ছা ও হুকুম ছাড়া যে এত বড় একটি ঘটনা মোটেও সম্ভব নয়, সে কথাটা বোঝার জন্য নিশ্চয়ই তদন্তের নামে ঢাকঢোল পিটিয়ে পাড়া মাতানোর প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু সেটাই করেছে সরকার। নেতৃত্বেও আবার এমন একজনকে রেখেছে, যিনি এককালে তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন। তার কারণে রিপোর্টটিকে সহজেই গ্রহণযোগ্য করে তোলা যাবে বলে মনে করা হয়েছে। এখানে সরকারের উদ্দেশ্যে কোনো ফাঁক নেই। মিস্টার মেননকে সামনে রেখে সরকার আসলে উদ্দিন সাহেবদের পার করে দেয়ার কৌশলই নিয়েছে। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, কৃতজ্ঞতা বলেও তো একটা কথা রয়েছে! যাদের আনুকূল্যে ক্ষমতায় আসা, তাদের বিরুদ্ধে আর যারাই হোক শেখ হাসিনার সরকার অন্তত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। এ যে শুধু কথার কথা নয় তারই প্রমাণ পাওয়া গেছে সংসদীয় উপকমিটির এখনও অপ্রকাশিত রিপোর্টে। সরকার শেষ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেয় কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সূত্রঃ দৈনিক আমার দেশ, ১০ ডিসেম্বর, ২০১১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন