পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১১

তবুও আবুল হোসেন!

কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিয়াছিল সে মরে নাই’।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সৈয়দ আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে এত দিন যেসব দুর্নীতি, অযোগ্যতা ও অনিয়মের অভিযোগ এসেছিল তার সবটা মিথ্যে নয়। 

সোমবার মন্ত্রিসভার দপ্তর পুনর্বিন্যাসে দেখা গেল, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সৈয়দ আবুল হোসেন বিতাড়িত হলেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। যোগাযোগ প্রযুক্তি আছে, কিন্তু পদ্মা সেতু নেই। নতুন যোগাযোগমন্ত্রী হয়েছেন ওবায়দুল কাদের, রেলমন্ত্রী হয়েছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। 
প্রথমেই যে প্রশ্নটি ওঠে তা হলো, একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে যখন গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবং সেই অভিযোগ যখন দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তাধীন থাকে, তখন তাঁকে মন্ত্রী পদে রাখা কতটা সমীচীন? যে ব্যক্তির কারণে পদ্মা সেতুর মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আটকে গেল, দেশের ও সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হলো, সেই ব্যক্তিকে কেন মন্ত্রিসভায় রাখা হবে? এর মাধ্যমে অন্য মন্ত্রীরা কী বার্তা পাবেন? তাঁরাও মনে করবেন, দায়িত্ব পালনে যতই অযোগ্য ও অদক্ষ হোন না কেন, মন্ত্রিত্ব যাবে না। বড়জোর মন্ত্রণালয় বদল হবে।

বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিক সমাজ যখন সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নামল, তখনো প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। এখন যোগাযোগ থেকে যে তাঁকে সরিয়ে দিলেন, নিশ্চয়ই তিনি এত দিনে বিশ্বব্যাংক এবং তাঁর দল ও জোটের সাংসদদের অভিযোগের সারবত্তা খুঁজে পেয়েছেন। 

আগের একটি লেখায় বলেছিলাম, প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ—মন্ত্রী না পদ্মা সেতু? যদি তিনি যোগাযোগমন্ত্রী পদে সৈয়দ আবুল হোসেনকে চান, তাহলে পদ্মা সেতু হবে না। আর যদি পদ্মা সেতু চান, তাহলে সৈয়দ আবুল হোসেনকে বাদ দিতে হবে। 

সৈয়দ আবুল হোসেন নিজেকে বরাবর ‘শতভাগ সৎ ও যোগ্যতম’ মন্ত্রী হিসেবে জাহির করতে চেয়েছেন। এমনকি জাতীয় সংসদে দলের অভিজ্ঞ ও প্রবীণ সাংসদেরা যখন দেশের রাস্তাঘাটের দুরবস্থার কথা তুলে ধরলেন, তখন এই মন্ত্রীবাহাদুর তাঁদের ব্যঙ্গবিদ্রূপ করতেও দ্বিধা করেননি। 

মন্ত্রিসভায় রদবদল যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারের স্বাভাবিক রীতি হলেও এ ক্ষেত্রে মোটেই স্বাভাবিক ছিল না। পুরো বিষয়টি ঘটেছে একজন সৈয়দ আবুল হোসেনের কারণে। কেননা তিনি একাধারে যোগাযোগ তথা সড়ক ও জনপথ, সেতু এবং রেলওয়ে বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। 

পদ্মা সেতুতে তাঁর মালিকানাধীন কোম্পানির হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে খোদ বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন আটকে দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষে অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তর পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ করলেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বিশ্বব্যাংকের কাছে চিঠি লিখে অভিযোগের জবাব দিলেন। কিন্তু সেসব জবাব কোনো কাজে আসেনি। ৪ ডিসেম্বরের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অর্থমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে বিশ্বব্যাংক জানতে চেয়েছে দুর্নীতি বন্ধে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে আরও বলা হয়, বিশ্বব্যাংকের মূল অভিযোগ যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে। যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত পদ্মা সেতুর কাজ এগোবে না।’ পরদিনই যোগাযোগমন্ত্রীর পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এতে প্রমাণিত হয়, মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক পুনর্বিন্যাস মোটেই রুটিন মাফিক কাজ ছিল না। 

পদ্মা সেতু নির্মাণ ছিল বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছিলেন, ‘বর্তমান সরকারের মেয়াদের মধ্যেই সেতুর কাজ শেষ করে জনগণের জন্য খুলে দেওয়া হবে।’ সেই লক্ষ্যে বেশ কিছু কাজও হয়েছে—স্থান নির্ধারণ, উদ্বাস্তু হওয়া মানুষদের পুনর্বাসন ও অর্থ সংগ্রহের ব্যাপারে দাতাদের সঙ্গে চুক্তি সই। কিন্তু মূল সেতুর কাজে ঠিকাদার নিয়োগ নিয়েই সমস্যা দেখা দেয়, যখন যোগাযোগমন্ত্রীর নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি গিয়ে মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কমিশন দাবি করেন।

এর আগে দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুর্বুদ্ধিও সরকারের কারও কারও মাথায় এসেছিল। বিকল্প অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ চলবে বলে তাঁরা প্রচার চালান। এতে বিশ্বব্যাংক আরও শক্ত অবস্থান নেয় এবং তারা জানিয়ে দেয়, উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করবে না। আর এ ধরনের কোনো বড় প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন আটকে দিলে তার নেতিবাচক প্রভাব অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের ওপরও পড়তে বাধ্য। 
যখন অভিযোগটি উত্থাপিত হয়েছিল, তখনই যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সৈয়দ আবুল হোসেনের হাত থেকে মুক্ত করা গেলে যে ফল পাওয়া যেত, এখন তা পাওয়া যাবে কি না সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেছেন, ‘সরকারের ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। এতে সরকার ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা আবার পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।’ 
নতুন মন্ত্রীরা কী করতে পারবেন, কী করতে পারবেন না সেটি পরের প্রশ্ন। অন্তত জনগণ মনে করছে, পদ্মা সেতু নির্মাণের বড় বাধাটি কেটে গেল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেকোনো বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন বলে সরকারের ঘনিষ্ঠজনেরা দাবি করেন। অনেক ক্ষেত্রে আমরাও তাঁকে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে দেখেছি। কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেনের ব্যাপারে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে কেন এতটা দেরি করলেন? এর পেছনে কী কারণ ছিল? ঢাকার রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন আছে।

শেখ হাসিনার আগের সরকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের অনেক বিষয়ে মিল নেই। কিন্তু যে বিষয়টিতে একটি অশুভ মিল লক্ষ করা গেল তা হলো, দুই আমলে মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্য সরকার বিতর্কিত ও সমালোচিত হয়েছে। আগের সরকারের আমলে সৈয়দ আবুল হোসেন ছিলেন প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু তিনি সরকারি পাসপোর্ট গোপন করে ব্যক্তিগত পাসপোর্ট নিয়ে সিঙ্গাপুর সফর করেছিলেন, তাঁরই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সাকোর কাজে। সেবারও সাকো, এবারও সাকো। তবে সেবারের ক্ষতিটা ছিল ব্যক্তি আবুল হোসেনের, এবারের ক্ষতিটা ধারণ করতে হলো গোটা দেশকে।

মন্ত্রিসভায় ছোট পরিবর্তনে বড় কিছু আশা করা যায় না। তবে এই পদক্ষেপকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এই কারণে যে রাজনীতি আবার কিছুটা হলেও রাজনীতিকদের হাতে ফিরে এসেছে। কোনো মন্ত্রিসভায় ব্যবসায়ীদের পাল্লা ভারী হলে সেটি আর গণতান্ত্রিক মন্ত্রিসভা থাকে না, হয়ে পড়ে ‘ব্যবসায়িক’ মন্ত্রিসভা। আগে বিএনপি মন্ত্রিসভায় ব্যবসায়ীদের আধিক্য ছিল, এখন আওয়ামী লীগও সেই দিকে ঝুঁকছে। 
দেশবাসী চায় রাজনীতিটা রাজনীতিকদের হাতেই থাকুক। তাঁরাই সরকার ও মন্ত্রিসভা চালাবেন। 
ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে কেউ দাতা হাতেম তায়ি হয়ে থাকলে তাঁরা রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দিতে পারেন। কিন্তু ব্যবসায়িক স্বার্থে রাজনীতিকে ব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সম্প্রতি এক নিবন্ধে জাতীয় সংসদে ৬৪ শতাংশ ব্যবসায়ীর প্রাদুর্ভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর সঙ্গে দেশবাসীও উদ্বিগ্ন। একসঙ্গে রাজনীতি ও ব্যবসা করলে যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দেয় তাতে ব্যবসাই জয়ী হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণ ও রাষ্ট্র। 

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে যেসব মৌলিক পার্থক্য ছিল তার একটি হলো, প্রথমটিতে ব্যবসায়ী ও অবসরপ্রাপ্তদের পাল্লা ভারী, দ্বিতীয়টিতে পেশাদার রাজনীতিকদের সংখ্যা বেশি। কিন্তু গত ১০-১৫ বছরে সেই ব্যবধানটি ঘুচে যেতে বসেছে। 

সরকারের মেয়াদ আছে মাত্র দুই বছর। পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হওয়া দূরের কথা, নতুন যোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন, পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করাই তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। এটি কেবল নতুন যোগাযোগমন্ত্রীর নয়, সরকারেরও চ্যালেঞ্জ। আমরা জানি না কীভাবে সেই চ্যালেঞ্জ তাঁরা মোকাবিলা করবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই অভিযোগ করেন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ সরকারের বিরুদ্ধে লেগেছে এবং গণতন্ত্রের ক্ষতি করছে। আমরা মনে করি, তাঁর এই বক্তব্যের কোনো ভিত্তি নেই। 

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কথা যদি সত্যও ধরে নিই, দেশের তাবৎ গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ, এমনকি বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে সরকারের যে ক্ষতি করতে পারেনি, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সদ্য বিতাড়িত মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন।

তবুও সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রী পদে বহাল রাখা হয়েছে যোগাযোগ থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে। যিনি সড়ক সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছেন, তিনি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে সফল হবেন, তার নিশ্চয়তা কী?


সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

সূত্রঃ প্রথম আলো, ০৮ ডিসেম্বর, ২০১১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন