পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

শুক্রবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১১

টেলিযোগাযোগ খাতে দুর্নীতি-অরাজকতা চরমে : মধুখানেওয়ালাদের পাকড়াও করতে হবে

আওয়ামী লীগ সরকারের বদৌলতে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে চরম নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাপক ঘুষ-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি খোদ ক্ষমতাসীনদের সংশ্লিষ্টতার কারণে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়। প্রতিদিন লোপাট হচ্ছে শত শত কোটি টাকা। দৈনিক আমার দেশ-এর এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে জানা গেছে, খাতটিতে এখন দুর্নীতিবাজ চক্রের রাজত্ব চলছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তারা তো বটেই, এই চক্রে এমন আরও অনেকেই জড়িত রয়েছেন—নাম ধরে যাদের সম্পর্কে বলাটা বিপজ্জনক। তারা সবাই মিলে টেলিযোগাযোগ খাতকে ‘মধুর চাক’ বানিয়ে ফেলেছেন। সরকার কিংবা ট্যাক্সদাতা জনগণ তাই বলে ওই চাকের মধু খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। সবটুকু মধু শুধু চক্রের লোকজনই চুষে চুষে খাচ্ছে। এরা কাজকারবারও চালাচ্ছে ডিজিটাল পন্থায় আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার করে। যেমন দেশে বসেই বিদেশি কোম্পানি সেজে চুটিয়ে ভিওআইপির ব্যবসা করছে তারা। তাদের মাধ্যমেই বিদেশ থেকে আসছে প্রায় ৪৫ শতাংশ কল। দেশ থেকেও কল যাচ্ছে একইভাবে। ফলে দুর্নীতিবাজদের পকেট স্ফীত হলেও দেশ ও সরকার হারাচ্ছে
বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা; প্রতিদিন কম করে হলেও ১০ কোটি টাকার আয় হাতছাড়া হচ্ছে। এসব কলের জন্য মূল্য কিন্তু বিটিসিএলকেই গুনতে হচ্ছে। কারণ, বিদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে বিটিসিএল। আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জের কলরেকর্ড মুছে ফেলার মাধ্যমেও চক্রটি দেশের সর্বনাশ করছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আড়াই কোটি মিনিট থেকে আন্তর্জাতিক কলের পরিমাণ নেমে এসেছে মাত্র এক কোটি ১০ লাখ মিনিটে। অথচ বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কলের সংখ্যা এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও ক্রমাগত অনেক বেড়ে যাওয়ার কথা। তথ্যাভিজ্ঞদের মতে, বর্তমানে এর পরিমাণ হওয়া উচিত অন্তত পাঁচ কোটি মিনিট। পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণ আসলে অবৈধ ভিওআইপির ব্যবসা। এসব বিষয়ে সরকারের বিরুদ্ধেই সরাসরি অভিযোগ উঠেছে। কারণ, আন্তর্জাতিক টেরিস্টেরিয়াল কেবল লাইসেন্স বা আইটিসি দেয়ার কর্মকাণ্ডে দুর্নীতির সূচনা করেছেন ক্ষমতাসীনরা—যাদের মধ্যে কয়েকজন মন্ত্রীও রয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এমন কারও কারও নামও এসেছে, যার নাম নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে জয়-জয়কার চলছে। কোনো এক মন্ত্রীর কোম্পানিকে আইন লঙ্ঘন করে তিনটির স্থলে ছয়টি পর্যন্ত আইটিসি লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। 

দুর্নীতিবাজ চক্রটি দেশের ল্যান্ডফোনেরও বারোটা বাজিয়েছে। মোবাইলের ব্যাপক প্রসারের ফলে এমনিতেই ল্যান্ডফোনের ব্যবহার ও কদর অনেক কমে গেছে, তার ওপর চক্রটি নানা কারসাজি করায় ল্যান্ডফোনের বিকাশের সম্ভাবনা অনেক কমে গেছে। অথচ দেশে দেশে ল্যান্ডফোনই এখনও যোগাযোগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। বাংলাদেশে ক’বছর আগে পর্যন্ত ল্যান্ডফোন যথেষ্ট লাভজনকও ছিল। তখনও একটি চক্রকে দুর্নীতিতে তত্পর দেখা গেছে। সংযোগ পাওয়া থেকে বিল কমানো-বাড়ানো এবং বিদেশে ফোন করা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে এই চক্রের হাতে গ্রাহকদের তখন জিম্মি থাকতে হতো। অর্থাত্ টেলিযোগাযোগ খাতে দুর্নীতি এবং দুর্নীতিবাজ চক্রের তত্পরতা দুটিই অনেক পুরনো। এটা সম্ভব হয়েছে কখনও কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে। অদূর ভবিষ্যতেও ব্যবস্থা নেয়ার যে কোনো সম্ভাবনা নেই, সে ব্যাপারে নতুন পর্যায়ে ধারণা পাওয়া গেছে টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে। কারণ, সর্বব্যাপী দুর্নীতির অভিযোগ উপেক্ষা করে মন্ত্রী রাজিউদ্দিন রাজু দিব্যি বলে বসেছেন, খাতটি নাকি নিয়মনীতির মধ্যেই চলছে! এই খাত থেকে যে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হচ্ছে, সে কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। 

লক্ষণীয় যে, নিয়মনীতির মধ্যে চলছে এবং বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় হচ্ছে ধরনের যুক্তি ও কথার আড়ালে দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেয়ার উদ্দেশ্য গোপন করা যায়নি। মন্ত্রী যা-ই বোঝাতে চান না কেন, অভিযোগ উঠেছে আসলে আয়ের পরিপ্রেক্ষিতেই। কারণ, মন্ত্রী যে ‘বিপুল’ পরিমাণের কথা বলেছেন, দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে তা আরও ‘বিপুল’ হতে পারত—১০ কোটি টাকার স্থলে এমনকি হাজার কোটি টাকাও আয় করতে পারত সরকার। কিন্তু সব জেনেও মন্ত্রী তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে আর যা-ই হোক, এ সরকারের অধীনে টেলিযোগাযোগ খাতে অন্তত দুর্নীতি বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমরা মনে করি, এমন অবস্থা চলতে পারে না। বন্ধ করাই শুধু নয়, দুর্নীতির মূলোচ্ছেদও করতে হবে। এটা সম্ভব হতে পারে বিশেষ করে মন্ত্রী ও কারও কারও স্বজনসহ ক্ষমতাসীনরা যদি দুর্নীতিবাজ চক্র থেকে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু মধুর স্বাদ পেয়ে গেছেন বলে স্বেচ্ছায় ও সহজে তারা বেরিয়ে আসতে চাইবেন না। এজন্যই দরকার মধুখানেওয়ালাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। একযোগে দরকার আইনের এমন কঠিন প্রয়োগ, যাতে কারও পক্ষেই বেআইনিভাবে লাইসেন্স পাওয়া এবং ভিওআইপির অবৈধ ব্যবহার করা সম্ভব না হয়। এটা দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয়দানকারী কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব কিনা—সেটাই এখন দেখার বিষয়।

সুত্রঃ দৈনিক আমার দেশ, ০২ ডিসেম্বর, ২০১১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন