পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

বুধবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১১

সব মন্ত্রীই উত্তম!

শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা মুখে স্বীকার না করলেও মেনে নিলেন তাঁর মন্ত্রিসভা ঠিকমতো চলছিল না। তিনি নিশ্চয়ই মন্ত্রিসভার শোভা বাড়ানোর জন্য দুজন মন্ত্রী নেননি। তাঁদের নিশ্চয়ই সেই কাজে লাগাবেন, আগের মন্ত্রীদের দিয়ে যা হচ্ছিল না। সোমবার রাতে টেলিভিশনে এই খবর প্রচারের সময় এটিএন বাংলার প্রতিবেদক বললেন, প্রায় তিন বছরের মাথায় এই মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে চাঞ্চল্য থাকলেও চমক নেই। কিছুদিনের মধ্যে দেশবাসী সেই চমক দেখবেন। গত তিন বছর কাজে না হলেও সরকার কথায় অনেক চমক দেখিয়েছে। আমরা নতুন চমকের অপেক্ষায় আছি। 

প্রধানমন্ত্রী যেভাবে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের পক্ষে সাফাই গাইলেন, তাতে মনে হবে, তাঁর কোনো মন্ত্রীই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হননি। সাংবাদিকেরা, বুদ্ধিজীবীরা খামোকা সমালোচনা করছেন। গতকাল ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী মন্ত্রিসভার বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘একটি মহল ভুল অবস্থান থেকে সরকারের সব উদ্যোগেরই সমালোচনা করে। নাম না বললেও বুঝতে অসুবিধা হয় না প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের সমালোচকদেরই ইঙ্গিত করেছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করি। আমরা সাদাকে সাদা ও কালোকে কালোই বলতে চাই। 

এই সরকার যখন যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে, আমরা তার প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়েছি, সরকার যখন জঙ্গি দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, আমরা তখনো তার পক্ষে দাঁড়িয়েছি। সরকার যখন প্রথম অধিবেশনেই সবগুলো সংসদীয় কমিটি গঠন করল, তখন আমরা তার প্রশংসা করেছি। আবার আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতা-কর্মীরা যখন সারা দেশে মাস্তানি-চাঁদাবাজি করেছে, ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ক্যাম্পাসে হল দখল করেছে, শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করেছে, তখন তার প্রতিবাদ করেছি। 

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাঁর মন্ত্রীরা সবাই ভালো কাজ করছেন। ভালোই যদি করবেন, তাহলে পদ্মা সেতুর কাজ আটকে গেল কেন? সারা দেশের রাস্তাঘাট বেহাল কেন? কী করে শেয়ারবাজার থেকে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হলো? বহুলালোচিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিটি হলো না কেন? এ ব্যাপারে তাঁর দুজন উপদেষ্টা, একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণ মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী কী করেছেন তা জানার অধিকার নিশ্চয়ই দেশবাসীর আছে। ভারতের একগুঁয়েমির কারণে যদি চুক্তি না হয়ে থাকে, কিংবা বাংলাদেশকে না জানিয়ে তারা একতরফাভাবে টিপাইমুখ বাঁধের উদ্যোগ নেয়, সেই কথাটিও সরকার কেন স্পষ্ট করে বলছেনা? সবকিছুতে ঢাক-গুড়গুড় ভাব কেন? 

খালেদা জিয়ার কথিত পূর্বমুখী কূটনীতিতে দেশবাসী পাঁচ বছরে কিছু পায়নি। বর্তমান সরকারের ‘চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্যের কূটনীতি’ও এখনো পর্যন্ত কোনো সুসংবাদ দিতে পারেনি। গভীর সমুদ্রবন্দর এখনো চিঠি চালাচালিতে সীমাবদ্ধ। হ্যাঁ, বৈদেশিক নীতি এই সরকারের যদি কোনো সাফল্য থেকে থাকে, তা হলো মালয়েশিয়ায় অবৈধ কয়েক লাখ শ্রমিক কাজের বৈধতা পেয়েছেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রণালয়ের চেয়ে পরিবহন-শ্রমিকদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত। এখনো পর্যন্ত পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ার কিংবা মাওয়া রুটে প্রয়োজনীয় ফেরির জোগান দিতে পারেননি। ড্রেজিংয়ের অভাবে নদীগুলোতে চড়া পড়ছে।

পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী পদোন্নতি পেলেও দেশের বনায়ন কিংবা পরিবেশ—কোনোটারই উন্নতি হয়নি। জলবায়ু তহবিলের অর্থ নিয়ে নয়ছয় করা নানা প্রকল্পের কথা শোনা যায়। বাংলাদেশে উন্নয়ন মানেই প্রকল্প এবং প্রকল্প মানেই মোটা অঙ্কের দাও মারা। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কথা না হয় বাদই দিলাম। প্রধানমন্ত্রী নিজের হাতে রেখেছেন, যেমন—জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা, বিদ্যু ৎ ও জ্বালানি, সোমবারের আগ পর্যন্ত পরিবেশ ও বন ইত্যাদিতে কোনো উল্লেখযোগ্য সফলতা আছে কি? 

ক্ষমতায় আসার আগে আওয়ামী লীগ ২০২১-এর যে রূপকল্প ঘোষণা করেছিল, তার কতটুক বাস্তবায়িত হয়েছে, কতটুকু হয়নি—সেই হিসাব চাওয়ার অধিকার কি ভোটারদের নেই? মহাজোট সরকারের শরিকরা এই মুহূর্তে কী ভাবছে, কী বলছে তা কি একবারও প্রধানমন্ত্রী শোনার চেষ্টা করছেন। গত রোববার প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষা ৎকারে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘সরকার পরিচালনায় আমাদের কোনো পরামর্শ নেওয়া হয় না।’ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বলেন, দেশে কী হচ্ছে, কীভাবে সরকার চলছে, তাঁরা জানেন না। এসব কিসের আলামত?

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীরা সরকারের ভালো কিছু দেখে না, কেবল সমালোচনা করেন। মন্ত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদেরও সরকারের সমালোচনা করতেন। দুর্মুখেরা বলছেন, এখন মন্ত্রিত্ব দিয়ে সেই সমালোচনা বন্ধ করা হলো। মন্ত্রিত্ব না পাওয়া আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও যদি সেই কৌশল নেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রী কতজনকে মন্ত্রী করবেন? 

প্রধানমন্ত্রী যদি স্বীকারই না করেন যে তাঁর সরকার, তাঁর মন্ত্রিসভা, তাঁর দলের ও জোটের সাংসদেরা কোনো ভুল করছেন, তাহলে তো শোধরানোরও প্রশ্ন আসে না। ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার দক্ষিণ এশিয়া সোশ্যাল ফোরামের সম্মেলনে যোগ দিতে সম্প্রতি ঢাকায় এসেছিলেন। ফিরে গিয়ে তিনি তাঁর যে অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তা শঙ্কিত হওয়ার মতো। তিনি বলেছেন, ভারতের মতো বাংলাদেশও দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। বছর দুই আগেও প্রধানমন্ত্রী যতটা জোরের সঙ্গে তাঁর মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই বলে সনদপত্র দিয়েছিলেন, এখন কি তা দিতে পারবেন? 

দেশের সাধারণ মানুষ ভালো নেই। শেয়ারবাজার থেকে যারা কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নিল না কেন? এটি কি সরকারের দুর্নীতিবিরোধী জেহাদের নমুনা!

প্রধানমন্ত্রী যদি সরকারের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে এতটাই আস্থাশীল হন, তাহলে তিনি বিএনপির নেতা ও ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকার চ্যালেঞ্জটি নিলেন না কেন? খোকা বলেছিলেন, ‘সরকার তাঁর জনপ্রিয়তায় ভয় পেয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করছেন। তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কোনো প্রার্থী আওয়ামী লীগের নেই। এত বড় একটি দল, এত নেতা, এত মন্ত্রী, এত উপদেষ্টা—ঢাকার মেয়রের এই চ্যালেঞ্জটি নিতে পারলেন না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাগ করছেন। সিটি করপোরেশন ভাগ করলেই যে মানুষ সেবা পাবে, সেই ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হলেন কীভাবে? নগরবাসীর অধিকাংশ সেবা, যেমন—গ্যাস, বিদ্যু ৎ, পানি—এসব তো সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। সিটি করপোরেশনের হাতে আছে রাস্তাঘাটের সংস্কার, রাস্তার বাতি জ্বালানো, পরিচ্ছন্নতা ও মশা মারা। আগে সিটি করপোরেশনের কর্মপরিধি ঠিক করুন। স্থানীয় সরকারের হাতে অন্তত কিছু ক্ষমতা ন্যস্ত করুন। 

জনমত উপেক্ষা করে সরকার ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাগ করেছে। গতকাল জাতীয় সংসদে আইন পাস হয়েছে। ৪০০ বছরের রাজধানীর কথা না হয় বাদই দিলাম, ১৫০ বছরের পৌরসভাকে বিভক্ত করার বদনাম কেন সরকার নিজের কাঁধে নিল? যুক্তরাজ্যে মার্গারেট থ্যাচার এ কাজ করে নিন্দিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশে নন্দিত হওয়ার সুযোগ নেই। প্রস্তাবিত আইনে তিন মাসের জন্য অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। সেই তিন মাসে নির্বাচন করা গেলে আগের জন বাদ দিয়ে নতুন প্রশাসক আসবেন। পাঁচ বছর এভাবে চালাতে পারলে ২০ জন প্রশাসক পাবে।

অনির্বাচিত সরকারের দোহাই দিয়ে ক্ষমতাসীনেরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছেন। আবার সিটি করপোরেশনগুলোতে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করতে চাইছেন। জেলা পরিষদে অনির্বাচিত দলীয় লোক বসানোর পাঁয়তারা করছেন। এসব কিসের আলামত? একেই বলে যখন যেমন সুবিধার গণতন্ত্র। সরকার বিএনপির বিরুদ্ধে হাজারটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে, দলবিলীন হয়ে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণীও করেছেন কোনো কোনো মন্ত্রী। বলেছেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপির আসন আরও কমে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কৌশল করলে নাকি সংসদে বিরোধী দলের অবস্থানও বিএনপির থাকত না। এত সব বড় চ্যালেঞ্জ প্রদানকারী মহাক্ষমতাধর দলটি ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকার ছোট্ট একটি চ্যালেঞ্জ নিতে পারল না! 

ঘরোয়া আলোচনায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন নামকরা অধ্যাপককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বড় বিপদ কী? তিনি মুহূর্ত বিলম্ব না করে বললেন, ‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা।’ কেন এটি বিপদ হিসেবে দেখছেন? তিনি জবাব দিলেন, ‘এ পর্যন্ত যেসব সংসদে ক্ষমতাসীনেরা দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে, তাদের কারও পরিণাম ভালো হয়নি। দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেশে কারও মাথা ঠিক থাকে না।’

সোমবার প্রথম আলোর অনলাইনে ঢাকার বিদায়ী মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সাক্ষা ৎকারটি পড়ছিলাম। তিনি দাবি করেছেন, দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে আওয়ামী লীগের সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আগে বিএনপিরও হয়েছিল। বিএনপি ক্ষমতা হারিয়েছে বলেই আজ সেই কঠিন সত্যটি স্বীকার করেছেন সাদেক হোসেন খোকা। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালে সেই দলের কোনো সাবেক মন্ত্রী ও নেতাও হয়তো এভাবে ভুল স্বীকার করবেন।
আমরা সেই সুদিন বা দুর্দিনের অপেক্ষায় আছি।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net


সুত্রঃ প্রথম আলো, ৩০ নভেম্বর, ২০১১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন