পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

সোমবার, ২১ নভেম্বর, ২০১১

টিপাইমুখ: সরকারের ভূমিকা উদ্বেগজনক

টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণ বিষয়ে একের পর এক বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করে চলেছে ভারত। ২২ অক্টোবর ড্যামটি নির্মাণের জন্য একটি যৌথ বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে সেখানে। এ ধরনের চুক্তি করার আগে বাংলাদেশকে জানানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা মানেনি ভারত। দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির ৯ নম্বর ধারা অনুসারে, একতরফাভাবে কোনো যৌথ নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ না থাকলেও একের পর এক তা করে চলেছে ভারত।

নিজ দেশের স্বার্থের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়নি বাংলাদেশ। এমনকি কখনো ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির অধীনে ভারতের দায়দায়িত্বের প্রসঙ্গও ভারতের কাছে উত্থাপন করেনি। বরং ভারতের মন্ত্রীদের প্রায় অবিকল ভাষায় বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও বলছেন এ প্রকল্পে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না! উজানের দেশে টিপাইমুখের মতো একটি দৈত্যাকৃতির জলাধার নির্মাণ ভাটির দেশে কোনো ক্ষতি করবে না—এটি স্বয়ং ভাটির দেশই বলছে—এই নজির সারা বিশ্বে আছে বলে আমার জানা নেই। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের ভূমিকা শুধু নতজানুমূলক নয়, একই সঙ্গে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
২. 
টিপাইমুখ বা অন্য কোথাও অভিন্ন নদীতে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তিটিই হচ্ছে দুই দেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক আইন। কারণ এই চুক্তিতে শুধু গঙ্গা নদীর পানি ভাগাভাগির কথা বলা হয়নি। এর ৯ নং অনুচ্ছেদে ‘ন্যায়পরায়ণতা (ইকুইটি), ন্যায্যতা (ফেয়ারনেস) এবং কারও ক্ষতি নয় (নো হার্ম)’—এসব নীতির ভিত্তিতে দুই দেশের সরকার অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগির জন্য চুক্তি সম্পাদন করতে একমত হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে, বাংলাদেশের সঙ্গে অবাধ তথ্যবিনিময়, আলোচনা এবং চুক্তি না করে ভারত কর্তৃক অভিন্ন নদীর ওপর এককভাবে প্রকল্প গ্রহণের কোনো বৈধতা নেই। আবার চুক্তিতে উল্লিখিত নো হার্ম নীতি অনুসারে টিপাইমুখের মতো কোনো প্রকল্প নির্মাণ করতে হলে অববাহিকাভিত্তিক যৌথ সমীক্ষা করার দায়দায়িত্ব ভারত কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পানিবিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত সম্প্রতি বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোনো যৌথ পরিবেশ সমীক্ষা ছাড়া টিপাইমুখ বাঁধ ভারত নির্মাণ করতে পারে না। 

দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছাড়াও আন্তর্জাতিক কিছু পরিবেশ চুক্তি রয়েছে যেগুলোর পক্ষরাষ্ট্র বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই। এসব চুক্তি (যেমন ১৯৯২ সালের বায়োডাইভারসিটি কনভেনশন, ১৯৭২ সালের ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কনভেনশন, ১৯৭১ সালের ওয়েটল্যান্ড কনভেনশন) অনুসারে, একতরফাভাবে টিপাইমুখের মতো প্রকল্প গ্রহণের অধিকার ভারতের নেই। আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে: প্রতিবাদ করার পক্ষে বহু এমন চুক্তি ও যুক্তি থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার এখনো সহায়-সম্বলহীনের মতো নির্ভর করে আছে ভারতের আশ্বাসের ওপর। অতীতের কথা বাদ দিই, এই সরকারের আমলেই সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা, তিস্তা চুক্তি সম্পাদনের মতো অনেক প্রতিশ্রুতি একের পর এক লঙ্ঘন করেছে ভারত। সরকারের টনক নড়ছে না যেন তবু!

৩.
একতরফাভাবে টিপাইমুখ প্রকল্প নির্মিত হলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না বলে ভারত যে আশ্বাস দিচ্ছে, তা শুধু আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্যই নয়, এটি বিভিন্ন কারণে অবিশ্বাস্যও।
প্রথমত, ওয়ার্ল্ড কমিশন অন ড্যামের ২০০০ সালে প্রকাশিত ড্যাম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক সুবিশাল গবেষণা রিপোর্টে বড় ড্যাম লাভের চেয়ে ক্ষতি অনেক বেশি করে, পরিষ্কারভাবে এ কথা বলা হয়েছে। শুধু পরিবেশগত দিক দেখলে এসব ক্ষতির মধ্যে রয়েছে বন ও বন্য প্রাণীর ক্ষয়ক্ষতি, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গতকরণ, প্রাণীবৈচিত্র্য বিনষ্টকরণ ও পানির মান (কোয়ালিটি) বিনষ্টকরণ। কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়, এসব ক্ষতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে অমেরামতযোগ্য এবং এ কারণে কিছু দেশ, বিশেষ করে আমেরিকা, এরই মধ্যে নির্মিত বড় ড্যামগুলো ভেঙে ফেলছে। সামাজিক প্রভাবসংক্রান্ত অংশে কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বড় ড্যামের কারণে বিশেষ করে উজান অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা এবং স্বাস্থ্যের মারাত্মক এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়।

দ্বিতীয়ত, ভারতের এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্বয়ং মনিপুর ও মিজোরামের মানুষ সোচ্চার হয়েছিল এর মারাত্মক পরিবেশগত প্রভাবের কথা বিবেচনা করে। মনিপুরের রাজধানী ইমফলে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে ২০টি অরাজনৈতিক সংগঠনের ডাকে হরতাল পালিত হয়েছে, আদালতে মামলা করা হয়েছে এবং এখনো নিয়মিত প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আরও উজানের একটি দেশ হিসেবে এ প্রকল্পের ক্ষয়ক্ষতি বাংলাদেশেই বেশি অনুভূত হওয়ার কথা।
তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা। ফারাক্কা ব্যারাজ হলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না—এই দাবি ভারত ১৯৫১ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত আমাদের অব্যাহতভাবে শুনিয়ে এসেছে। ১৯৭৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভারত ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের কিছু সুবিধা হবে—এই দাবিও করেছে। ফারাক্কা ব্যারাজের অপূরণীয় ক্ষতির তিক্ত অভিজ্ঞতার পর টিপাইমুখ ড্যাম ক্ষতিকর হবে না, ভারতের এই দাবি অন্ধের মতো মেনে নেওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

বরাক নদীর ওপর টিপাইমুখ ড্যম নির্মাণসহ তিস্তা, গঙ্গা, দুধকুমারী, খোয়াই, মনু, মুহুরী, ধরলাসহ বিভিন্ন যৌথ নদীর ওপর ভারত একতরফাভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। তবে টিপাইমুখের আয়তন ও ব্যাপ্তি হবে এর মধ্যে সবচেয়ে বিশাল। ভূকম্পন এলাকায় অবস্থিত বলে এটি কখনো ভেঙে পড়লে তলিয়ে যেতে পারে সুরমা ও কুশিয়ারার দুই কূলের বিশাল অঞ্চল।
টিপাইমুখ ড্যামের সঙ্গে সঙ্গে ফুলের তল ব্যারাজ নির্মিত হলে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি ফারাক্কাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফুলের তল ব্যারাজ নির্মাণের কথা ভারতের আদি প্রস্তাবে রয়েছে। এটি যে এখন তার প্রকল্পের অংশ নয়, সে সংক্রান্ত কোনো দলিল-দস্তাবেজ বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই। আমাদের একটি বড় উদ্বেগ এটিও।

৪.
টিপাইমুখ ড্যাম প্রজেক্টের বিষয়ে বাংলাদেশকে তাই অবিলম্বে সরকারিভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে। এ প্রকল্পসংক্রান্ত সব সমীক্ষা, প্রতিবেদন ও প্রকল্পপত্র বাংলাদেশকে দেওয়ার জোর অনুরোধ ভারতকে জানাতে হবে। সব কাগজপত্র যৌথ নদী কমিশন, পানি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ক্ষয়ক্ষতি যথাসম্ভব কমিয়ে এনে (যেমন: টিপাইমুখ ড্যামের পরিবর্তে অনেকগুলো ছোট আকৃতির ড্যাম নির্মাণ করে এবং ফুলের তলে ব্যারাজ নির্মাণ পরিকল্পনা বাতিল করে) প্রকল্পের সুবিধা (যেমন: বিনা মূল্যে বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট পরিমাণ জলবিদ্যুৎ দিয়ে) আদৌ বাংলাদেশ সুনিশ্চিতভাবে পেতে পারে কি না, সেটিও আমাদের দক্ষতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এ বিবেচনা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে ভারতকে এই প্রকল্পের বিষয়ে সব কাজকর্ম বন্ধ রাখার দাবি সরকারকে করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এসব করবে কি না, এই উদ্বেগ আমাদের থাকছেই।

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সুত্রঃ প্রথম আলো, ২১ নভেম্বর ২০১১ 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন