পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

শনিবার, ৫ নভেম্বর, ২০১১

হজ্ব - '' লাব্বাইক, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক''

আরবি ‘হজ্ব’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নিয়ত করা, কোনো পবিত্র স্থানে গমনের ইচ্ছা পোষণ করা, জিয়ারতের উদ্দেশ্যে প্রতিজ্ঞা করা প্রভৃতি। ইসলামের পরিভাষায় নির্দিষ্ট দিনসমূহে কাবাগৃহ এবং এর সংলগ্ন কয়েকটি সম্মানিত স্থানে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ অনুসারে অবস্থান করা, জিয়ারত করা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করার নামই হজ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে হজের বহুবিধ কল্যাণ ও উপকারিতার বর্ণনা রয়েছে। ইবাদতমূলক দিক থেকে সূরা আল-হজ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। এখানেই ইসলামে হজের বিধানগত মর্যাদা অনুধাবন করা যায়। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, ‘এবং তারা এ প্রাচীন ঘরের (কাবাগৃহ) তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করবে।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত-২৯)। 


মূলত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজ। আল্লাহর কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণের মুহুর্মুহু ধ্বনিতে ৯ জিলহজ মক্কা মোয়াজ্জমায় সুবিশাল আরাফাতের ময়দান মুখরিত ও প্রকম্পিত করে বিশ্বের লাখ লাখ মুমিন বান্দা পবিত্র হজব্রত পালন করেন। ভাষা, বর্ণ ও লিঙ্গের ভেদাভেদ ভুলে বিশ্বের প্রায় ১৭২টি দেশের ৩৫-৪০ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান প্রতিবছর হজ পালনের লক্ষ্যে মিনা থেকে আরাফাত ময়দানে গমন করেন। তাঁরা পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হতে আত্মশুদ্ধির শপথ ও আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করার পরম সৌভাগ্য অর্জন করে সৃষ্টিকর্তার দরবারে ক্ষমার আবেদন জানান।


হজ বিশ্ব মুসলিমের মিলনস্থল ও ঐক্যের প্রতীক। হজের মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের স্বরূপ প্রকাশ পায়। এ মহামিলন কেন্দ্রে দুনিয়ার সব দেশের, সব অঞ্চলের, সব বংশের, সব বর্ণের, বিভিন্ন ভাষার, আকার-আকৃতির মুসলমান মহান সৃষ্টিকর্তার গভীর প্রেমে ব্যাকুল হয়ে কাফনসদৃশ সাদা পোশাকে সজ্জিত হয়ে একই বৃত্তে, একই কেন্দ্রবিন্দুতে সমবেত হন। মক্কা শরিফ থেকে হজের ইহরাম পরিহিত লাখ লাখ মুসলিম নর-নারী, যুবক ও বৃদ্ধ গভীর ধর্মীয় আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়াননিয়ামাতা লাকা ওয়ালমুল্ক, লা শারিকা লাকা’, অর্থাৎ ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই, আপনার মহান দরবারে হাজির, নিশ্চয়ই সব প্রশংসা, নিয়ামত এবং সব রাজত্ব আপনারই, আপনার কোনো শরিক নেই’—এ হাজিরি তালবিয়া পাঠ করতে করতে হাজিরা মিনাতে এসে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজ আদায় করেন।


বাদ জোহর মিনা থেকে উচ্চ স্বরে তালবিয়া পাঠ করতে করতে আরাফাতের বিশাল প্রান্তরে হাজিরা উপস্থিত হন। জোহরের নামাজের আগে আরাফাত ময়দানের মসজিদে নামিরার মিম্বারে দাঁড়িয়ে হাজিদের উদ্দেশে হজের খুতবা দেওয়া হয়, যাতে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি, বিশ্বশান্তি ও কল্যাণের কথা ব্যক্ত করা হয়। খুতবা শেষে জোহর ও আসরের ওয়াক্তের মধ্যবর্তী সময়ে জোহর ও আসরের কসর নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা হয়। সূর্যাস্তের পূর্বপর্যন্ত সব হাজি আরাফাতের ময়দানেই অবস্থান করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর জিকির-আজকারে মশগুল থাকেন। হজের দিনে সারাক্ষণ আরাফাতে অবস্থান করা ফরজ। হজ পালন তথা এ দিনে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের প্রতিদান হলো, আল্লাহ সেসব হাজি মুমিন বান্দাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করেন।


হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে আল্লাহ তাআলা আরাফার দিনে ফেরেশতামণ্ডলীকে ডেকে বলেন, ‘হে ফেরেশতাগণ! তোমরা লক্ষ করো, আমার বান্দাগণ কী প্রকারে বহু দূর-দূরান্ত থেকে এসে আজ আরাফাত মাঠে ধুলা-বালুর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তোমরা সাক্ষী থাকো, যারা আমার ঘর (কাবা) জিয়ারত করতে এসে এত কষ্ট স্বীকার করছে, নিশ্চয়ই আমি তাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিলাম।’ (বুখারি) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পানি যেমন ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়, হজও তেমন গুনাহসমূহ ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়।’ (বায়হাকি) সঠিকভাবে হজ আদায়কারীকে দেওয়া হয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘বিশুদ্ধ মকবুল একটি হজ পৃথিবী ও এর মধ্যকার সব বস্তু থেকে উত্তম। বেহেশত ব্যতীত আর কোনো কিছুই এর বিনিময় হতে পারে না।’ (বুখারি ও মুসলিম) 


হজ মানুষকে ইসলামের সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ শিক্ষা দেয়। বিশ্বের সব মুসলমান হজের মৌসুমে মক্কা শরিফে একতাবদ্ধ হন এবং কাবাঘর তাওয়াফ, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, সাফা-মারওয়ায় দৌড়ানো ইত্যাদি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন। এতে ঐক্যবোধ জাগরিত হয় এবং সামাজিক জীবনে এর প্রতিফলন দেখা যায়। হজ মানুষের মধ্যে সামাজিক সাম্যবোধ জাগ্রত করে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমান সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সবাই সেলাইবিহীন একই ধরনের সাদা পোশাক শরীরে জড়িয়ে হজ পালন করেন। ফলে তাঁদের মধ্যে যাবতীয় বৈষম্য বিদূরিত হয় এবং সাম্যের অনুপম মহড়ার অনুশীলন হয়। হজ মানুষের মনে-প্রাণে সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।
হজই একমাত্র ইবাদত, যা পালনের সময় দুনিয়ার সব মায়া-মোহাব্বত ছেড়ে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর দিকে ধাবিত হতে হয়। একজন হাজি পার্থিব সব ধন-সম্পদ, স্ত্রী, সন্তানসন্ততি ছেড়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে কাবা শরিফ পানে পাড়ি জমান। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ‘তিন ধরনের ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিনিধি বা মেহমান। তাঁরা হলেন—গাজি বা জিহাদ করে যিনি জয়লাভ করেছেন, হজ সম্পাদনকারী এবং উমরা পালনকারী।’


হজ মুসলমানদের মনে সর্ববিষয়ে আল্লাহর আনুগত্যের স্বীকৃতি, হূদয়ের পবিত্রতা, ঈমানের শক্তি বৃদ্ধি ও তাঁদের আধ্যাত্মিক জীবনের চরম উন্নতি সাধনের দ্বারা অন্তরে পারলৌকিক সুখের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। আর সাম্য, মৈত্রী, বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির সৃষ্টি এবং ভাষা ও বর্ণবৈষম্য ভাবের উৎখাত করে। এতদ্ব্যতীত হজে গিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহখাতাসমূহের জন্য অত্যন্ত বিনয়সহকারে মনের আবেগ মিটিয়ে, অশ্রু বিসর্জন দিয়ে সব অপরাধ ক্ষমা প্রার্থনা ও সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের জন্য দোয়া করে থাকেন এবং বাকি জীবন আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলার জন্য প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে আসেন। তাই হজরত ইমাম আবু হানিফা (র.) পবিত্র হজকে ইসলামের শ্রেষ্ঠতম ইবাদত বলে অভিহিত করেছেন। সুতরাং, যত শিগগির সম্ভব হজ পালনের আগে আমাদের নিয়তের বিশুদ্ধতা প্রয়োজন। হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ভালোভাবে অবগত হয়ে সামর্থ্যবান মুসলমানদের জীবনে একবার হজ সম্পাদন করা একান্ত আবশ্যক। 


 ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

সুত্রঃ প্রথম আলো, ০৫ নভেম্বর, ২০১১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন