পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

বুধবার, ২ নভেম্বর, ২০১১

রাজনৈতিক সংস্কৃতি-'' রাজনীতিকেরা কেন জনগণকে বোকা ভাবেন!''

ওপরের শিরোনামটিকে বিষয় করে জাতির কাছে প্রশ্ন তুলেছেন শ্রদ্ধাভাজন সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম তাঁর সম্পাদিত ডেইলি স্টার পত্রিকায়। ওই মন্ত্রব্য প্রতিবেদনে তিনি আমাদের অর্থাৎ জনগণের পক্ষ নিয়ে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, সম্মানীয়া প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেত্রী এমন কিছু বিষয়ে জাতিকে নসিহত করছেন যে, মনে হয় জাতি যেন ঘুমিয়ে আছে, জাতি কিছু জানে না, তাদের যা-ই শোনাবে, তারা তা-ই শুনবে। মাহ্ফুজ আনাম রাজনৈতিক নেতৃত্বের অর্বাচীনতার দুটো উদাহরণ দিয়েছেন। প্রথমটি হলো, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের আপত্তির ব্যাপারে তাঁর মন্তব্য, যেখানে তিনি বলেছেন যে সাকো কোম্পানি (সৈয়দ আবুল হোসেন কোম্পানি) দুর্নীতি করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো, বিরোধী দলের নেত্রীর বিস্ময়কর উক্তি যে আওয়ামী লীগ নাকি মুক্তিযুদ্ধ করেনি, সে মন্তব্যটি। মাহ্ফুজ আনাম বলছেন, যেখানে বিশ্বব্যাংক নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে (যেটা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছে) পদ্মা সেতুর সহায়তা বন্ধ রেখেছে এবং এ কারণে এই সরকারের জনগণের কাছে প্রদত্ত অঙ্গীকার ‘পদ্মা সেতু এ সরকারের আমলেই তৈরি হয়ে যাবে’ সেটা পর্যন্ত হুমকির মুখে রয়েছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রী সেটিকে বড় করে না দেখে যোগাযোগমন্ত্রীর ভূমিকাকে সমর্থনের চেষ্টায় আছেন এবং সেটা জনগণকে বোঝাতে চাইছেন, এবং এর থেকে মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী মানুষের প্রাপ্ত তথ্য ও বোধশক্তিকে অবজ্ঞা করছেন।


আর বিরোধী দলের নেত্রীর মন্তব্য তো আরও শিরদাঁড়া কাঁপানো। তিনি সব সময় মনে করেন এবং বলেও থাকেন যে যুদ্ধাপরাধ বলে কিছু হয়নি। এ দেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ও বাঙালির বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দল ও তাদের তাঁবেদার বাহিনী শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীগুলো কোনো যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেনি, এটা হচ্ছে মোটামুটি তাঁর স্থায়ী ধারণা। কিছুদিন আগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এ রকম মন্তব্যও করেছেন যে জনৈক শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধী নেতা কোথায় নির্দিষ্টভাবে খুন বা ধর্ষণ করেছেন, তার সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করতে না পারলে তাঁকে যুদ্ধাপরাধী বলা যাবে না। যুক্তিটা এ রকম যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে নুরেমবার্গ বিচারালয়ে যখন যুদ্ধাপরাধের দায়ে জার্মান সেনাপতিদের বিচার হচ্ছিল, তখন যেন জানতে চাওয়া হচ্ছিল এসব সেনাপতি প্রত্যক্ষভাবে ইহুদি নিধনের জন্য নির্দিষ্টকৃত গ্যাস চেম্বারে গিয়ে গ্যাস উন্মোচনের সুইচটি টিপেছিল কি না! সে যা-ই হোক, বিরোধী দলের নেত্রীর যে কথাটি মাহ্ফুজ আনাম মনে করছেন যে লোকজনকে বোকা ভাবার মওকা, সেটি হচ্ছে আওয়ামী লীগ নাকি মুক্তিযুদ্ধ করেনি। এটা অবশ্য সত্য যে দেশজুড়ে যে লাখ লাখ লোক মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, তারা সবাই আওয়ামী লীগ করত না, কিন্তু তার চেয়েও বড় ঐতিহাসিক সত্য এটি যে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই সমগ্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। বেসামরিক দিক থেকে তো বটেই, সামরিক দিক থেকেও। সত্যিই মানুষকে বোকা ও (বোবা) না ভাবলে এমন মন্তব্য করা সহজ নয়।


মাহ্ফুজ আনাম তাঁর চমৎকার মন্তব্য প্রতিবেদন শেষ করছেন অনেকটা হতাশার ভঙ্গিতে এবং উপায়ান্তর না দেখে ‘যে দেশ যে রকম সে দেশ তেমন নেতা পায়’ প্রবচনের সমর্থনে। তিনি বলছেন, রাজনৈতিক শীর্ষ নেতারা মানুষকে বোকা ভাববেন না কেন। কারণ, তাঁদের যেকোনো জনসভায় লাখ লাখ মানুষ জমায়েত হয়। সেটা ঢাকার কেন্দ্রীয় স্থলে হলেও যা, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল গন্ডামারাতে হলেও তা-ই। কিন্তু কেন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের এত জনসমর্থন দেখা যায়, তারও একটি ব্যাখ্যা মাহ্ফুজ আনাম বা আমরা যাঁরা এ বিষয়ে সমান বিস্ময়বোধ অনুভব করি, আমাদের দেওয়া উচিত।
খুবই সীমিত বোঝার ক্ষমতা দিয়ে আমি এর একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চাই। দেখি, কীভাবে এগোয় কথাটা।


প্রথম যুক্তি হলো, বেকারত্ব: লেখক হুমায়ূন আহমেদ কোথায় যেন লিখেছিলেন যে রাস্তায় কেউ তরমুজ খেলে ষাটজন লোক তা দাঁড়িয়ে দেখে। অর্থাৎ বেকার লোকদের তরমুজ খাওয়া দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। ঠিক সে রকম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের জনসভায় লোকের সমাগম হওয়া ঠিক যে তাঁদের বাচন ও বচন উপভোগ করার জন্য বা তাঁদের সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের কারণে লোকজন হামলে পড়ে তা নয়, কিংবা তাঁদের কথার সমর্থনে তারা জনসভায় যায় তা নয়, তাদের আর কোনো কাজ করার থাকে না বলে তারা জনসভায় যায়। আর এরপর যদি টাকা দিয়ে লোক আনার ব্যবস্থা থাকে জনসভায়, তাহলে তো বেকার লোকদের আয়েরও রাস্তা খোলে।


দ্বিতীয় যুক্তি হলো ব্যক্তিপূজা: আমার এক বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিকমনা ছাত্র পরবর্তী জীবনে দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে। এ পর্যায়ে তার সঙ্গে একবার আমার দূরের কোনো ভ্রমণে দেখা হয়। কথাবার্তার একসময় তার নেত্রীর প্রসঙ্গে কিছু বলতে গিয়ে লক্ষ করলাম সে কোনো সময় নেত্রীর নাম বলছিল না, বলছিল বিশেষণসহকারে নেত্রীর পদবিগুলো। আমার আরেক ছাত্র, সেও বুদ্ধিদীপ্ত, পরবর্তী জীবনে উত্তরাধিকারসূত্রে গদিনশিন পীর হয়। তার বিয়ের দাওয়াত পেয়ে গেলাম এবং পরবর্তী সময়ে তার বউভাতের দাওয়াতে গেলাম পীরের আস্তানায়। একপর্যায়ে স্থানীয় একজন লোকের কাছে কী প্রসঙ্গে আমার ছাত্রের নাম উল্লেখ করলে, ওই লোক আমাকে শুধরে দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পীর সাহেবের সব বিশেষণযুক্ত শব্দ উচ্চারণ করে তারপর থামল। আমার প্রথম ছাত্রের আচরণ এবং দ্বিতীয় ছাত্রের শিষ্যের আচরণের মধ্যে যদি কোনো পার্থক্য না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সমাজের সংকট খুব গভীরে। সংসদে সাংসদেরা যখন ভাষণ দেন, তখন গুনে দেখবেন কতবার তাঁরা নিছক প্রয়োজনবিহীনভাবে তাঁদের নেত্রীদের স্তুতি করে থাকেন।


ব্যক্তিপূজা বা কাল্টিজম সব সমাজে কমবেশি আছে, কিন্তু আমাদের সমাজে এটি একটি মারাত্মক ব্যাধির মতো এবং কেন এটা তা-ই, তার কারণ হচ্ছে জ্ঞানের রাস্তা খোঁজার ব্যাপারে আমাদের সীমাবদ্ধতা। যে সমাজে বলা হচ্ছে এর বাইরে তুমি চিন্তা করতে পারবে না, এর বাইরে তুমি প্রশ্ন করতে পারবে না কিংবা অমুক বিষয়ে বহু আগেই সমাধান দেওয়া আছে, সে সমাজে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে এবং রাজনৈতিক পথ খোঁজার ক্ষেত্রে যে অনিবার্য পতনশীলতা আসে, সেটাকে ঢাকা দিতে দুটো পথ তৈরি হয়—একটি হচ্ছে ব্যক্তিপূজা, আরেকটি হচ্ছে সম্মোহিত বা মিস্টিফাইড থাকা এবং চিন্তা করে দেখলে, এ দুটো কাজই খুব সহজ পন্থার কাজ।


আমার এক সহকর্মী রসিক ছিলেন। তিনি আরেকজন জাতীয়ভাবে পরিচিত সহকর্মীকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। এবং শিক্ষকদের সভা-সমিতিতে প্রথম সহকর্মী দ্বিতীয় সহকর্মীকে উদ্দেশ করে বলতেন, অমুক যা বলেন, আমার কথাও তা-ই। বড় দলগুলোর রাজনৈতিক চর্চায় দেখি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ভার নেত্রীর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। এগুলো হচ্ছে সহজ পন্থা। আপনার চিন্তাটা আরেকজন করে নিল। একটি দেশের বেশির ভাগ লোক যখন সহজ কাজগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নবিহীন করতে থাকে, তখন সে সমাজ এগোয় না। পাঠাগার ছেড়ে, গবেষণাগার ছেড়ে, সাধনা ছেড়ে, বিজ্ঞান ছেড়ে, স্বাস্থ্য ছেড়ে, সংসদ ছেড়ে এবং অর্থনৈতিক উৎপাদন ছেড়ে সবাই যদি রাস্তায় তোরণ তৈরি, জনসভায় হুংকার দেওয়া, আধ্যাত্মিকতা চর্চার নামে অলস জীবন যাপন করা কিংবা অযাচিতভাবে বিদেশ ভ্রমণের পাঁয়তারা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাহলে পদ্মা সেতু দিল্লি দুরস্ত হয়ে যাবে বৈকি।


আরেকটা জিনিস সাধারণভাবে জনগণকে অন্ধ করে রাখতে সাহায্য করে, সেটা হলো সম্মোহিত হয়ে থাকা। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ধর্মচর্চায় যেসব দেশ মানবতার উদ্বোধনে উন্নতি লাভ করেছে, সেসব দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায়, সেখানে জ্ঞান-সাধনার চর্চায় এবং ধর্মের তাত্ত্বিক অনুশীলনে একটি শক্তিশালী অসম্মোহিত হওয়ার প্রচেষ্টা তৈরি হয়েছিল। অসম্মোহিত বা ডিমিস্টিফাইড হওয়ার প্রক্রিয়া যদি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর দ্বারা উদ্বোধিত না হয়, তাহলে কিন্তু জাতি দিকনির্দেশনা পাবে না। বিতর্ক থাকতে হবে, বিতর্ক সহ্য করতে হবে, পুরোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হবে, নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি হবে, নতুন প্রশ্নের অবসান হবে, তখন আরও নতুন প্রশ্ন উঠে আসবে। সমাজে জঙ্গম পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর সদস্যরাই।


আমাদের সমাজে ডিমিস্টিফিকেশনের খুব অভাব হয়েছে জীবন যাপনে এবং জীবনচিন্তায়। এ অভাবের সুযোগ নিচ্ছে সহজপন্থী রাজনৈতিক নেতারা ব্যক্তিপূজার শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করে এবং জনগণকে সহজ পথের ধোঁকা দিয়ে। জনগণও সহজ পথটা খোঁজে এবং ভালোবাসে; কেননা তাদের চোখের সামনে কঠিন পথের অভিযাত্রী নেই।


ড. মোহীত উল আলম, বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি, ইউল্যাব, ঢাকা।
mohit_13_1952@yahoo.com




সুত্রঃ প্রথম আলো, ০২ নভেম্বর, ২০১১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন