পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

বুধবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১১

সব মন্ত্রীই উত্তম!

শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা মুখে স্বীকার না করলেও মেনে নিলেন তাঁর মন্ত্রিসভা ঠিকমতো চলছিল না। তিনি নিশ্চয়ই মন্ত্রিসভার শোভা বাড়ানোর জন্য দুজন মন্ত্রী নেননি। তাঁদের নিশ্চয়ই সেই কাজে লাগাবেন, আগের মন্ত্রীদের দিয়ে যা হচ্ছিল না। সোমবার রাতে টেলিভিশনে এই খবর প্রচারের সময় এটিএন বাংলার প্রতিবেদক বললেন, প্রায় তিন বছরের মাথায় এই মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে চাঞ্চল্য থাকলেও চমক নেই। কিছুদিনের মধ্যে দেশবাসী সেই চমক দেখবেন। গত তিন বছর কাজে না হলেও সরকার কথায় অনেক চমক দেখিয়েছে। আমরা নতুন চমকের অপেক্ষায় আছি। 

প্রধানমন্ত্রী যেভাবে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের পক্ষে সাফাই গাইলেন, তাতে মনে হবে, তাঁর কোনো মন্ত্রীই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হননি। সাংবাদিকেরা, বুদ্ধিজীবীরা খামোকা সমালোচনা করছেন। গতকাল ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী মন্ত্রিসভার বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘একটি মহল ভুল অবস্থান থেকে সরকারের সব উদ্যোগেরই সমালোচনা করে। নাম না বললেও বুঝতে অসুবিধা হয় না প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের সমালোচকদেরই ইঙ্গিত করেছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করি। আমরা সাদাকে সাদা ও কালোকে কালোই বলতে চাই। 

এই সরকার যখন যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে, আমরা তার প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়েছি, সরকার যখন জঙ্গি দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, আমরা তখনো তার পক্ষে দাঁড়িয়েছি। সরকার যখন প্রথম অধিবেশনেই সবগুলো সংসদীয় কমিটি গঠন করল, তখন আমরা তার প্রশংসা করেছি। আবার আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতা-কর্মীরা যখন সারা দেশে মাস্তানি-চাঁদাবাজি করেছে, ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ক্যাম্পাসে হল দখল করেছে, শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করেছে, তখন তার প্রতিবাদ করেছি। 

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাঁর মন্ত্রীরা সবাই ভালো কাজ করছেন। ভালোই যদি করবেন, তাহলে পদ্মা সেতুর কাজ আটকে গেল কেন? সারা দেশের রাস্তাঘাট বেহাল কেন? কী করে শেয়ারবাজার থেকে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হলো? বহুলালোচিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিটি হলো না কেন? এ ব্যাপারে তাঁর দুজন উপদেষ্টা, একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণ মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী কী করেছেন তা জানার অধিকার নিশ্চয়ই দেশবাসীর আছে। ভারতের একগুঁয়েমির কারণে যদি চুক্তি না হয়ে থাকে, কিংবা বাংলাদেশকে না জানিয়ে তারা একতরফাভাবে টিপাইমুখ বাঁধের উদ্যোগ নেয়, সেই কথাটিও সরকার কেন স্পষ্ট করে বলছেনা? সবকিছুতে ঢাক-গুড়গুড় ভাব কেন? 

খালেদা জিয়ার কথিত পূর্বমুখী কূটনীতিতে দেশবাসী পাঁচ বছরে কিছু পায়নি। বর্তমান সরকারের ‘চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্যের কূটনীতি’ও এখনো পর্যন্ত কোনো সুসংবাদ দিতে পারেনি। গভীর সমুদ্রবন্দর এখনো চিঠি চালাচালিতে সীমাবদ্ধ। হ্যাঁ, বৈদেশিক নীতি এই সরকারের যদি কোনো সাফল্য থেকে থাকে, তা হলো মালয়েশিয়ায় অবৈধ কয়েক লাখ শ্রমিক কাজের বৈধতা পেয়েছেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রণালয়ের চেয়ে পরিবহন-শ্রমিকদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত। এখনো পর্যন্ত পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ার কিংবা মাওয়া রুটে প্রয়োজনীয় ফেরির জোগান দিতে পারেননি। ড্রেজিংয়ের অভাবে নদীগুলোতে চড়া পড়ছে।

পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী পদোন্নতি পেলেও দেশের বনায়ন কিংবা পরিবেশ—কোনোটারই উন্নতি হয়নি। জলবায়ু তহবিলের অর্থ নিয়ে নয়ছয় করা নানা প্রকল্পের কথা শোনা যায়। বাংলাদেশে উন্নয়ন মানেই প্রকল্প এবং প্রকল্প মানেই মোটা অঙ্কের দাও মারা। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কথা না হয় বাদই দিলাম। প্রধানমন্ত্রী নিজের হাতে রেখেছেন, যেমন—জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা, বিদ্যু ৎ ও জ্বালানি, সোমবারের আগ পর্যন্ত পরিবেশ ও বন ইত্যাদিতে কোনো উল্লেখযোগ্য সফলতা আছে কি? 

ক্ষমতায় আসার আগে আওয়ামী লীগ ২০২১-এর যে রূপকল্প ঘোষণা করেছিল, তার কতটুক বাস্তবায়িত হয়েছে, কতটুকু হয়নি—সেই হিসাব চাওয়ার অধিকার কি ভোটারদের নেই? মহাজোট সরকারের শরিকরা এই মুহূর্তে কী ভাবছে, কী বলছে তা কি একবারও প্রধানমন্ত্রী শোনার চেষ্টা করছেন। গত রোববার প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষা ৎকারে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘সরকার পরিচালনায় আমাদের কোনো পরামর্শ নেওয়া হয় না।’ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বলেন, দেশে কী হচ্ছে, কীভাবে সরকার চলছে, তাঁরা জানেন না। এসব কিসের আলামত?

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীরা সরকারের ভালো কিছু দেখে না, কেবল সমালোচনা করেন। মন্ত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদেরও সরকারের সমালোচনা করতেন। দুর্মুখেরা বলছেন, এখন মন্ত্রিত্ব দিয়ে সেই সমালোচনা বন্ধ করা হলো। মন্ত্রিত্ব না পাওয়া আওয়ামী লীগের অন্য নেতারাও যদি সেই কৌশল নেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রী কতজনকে মন্ত্রী করবেন? 

প্রধানমন্ত্রী যদি স্বীকারই না করেন যে তাঁর সরকার, তাঁর মন্ত্রিসভা, তাঁর দলের ও জোটের সাংসদেরা কোনো ভুল করছেন, তাহলে তো শোধরানোরও প্রশ্ন আসে না। ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার দক্ষিণ এশিয়া সোশ্যাল ফোরামের সম্মেলনে যোগ দিতে সম্প্রতি ঢাকায় এসেছিলেন। ফিরে গিয়ে তিনি তাঁর যে অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তা শঙ্কিত হওয়ার মতো। তিনি বলেছেন, ভারতের মতো বাংলাদেশও দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। বছর দুই আগেও প্রধানমন্ত্রী যতটা জোরের সঙ্গে তাঁর মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই বলে সনদপত্র দিয়েছিলেন, এখন কি তা দিতে পারবেন? 

দেশের সাধারণ মানুষ ভালো নেই। শেয়ারবাজার থেকে যারা কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নিল না কেন? এটি কি সরকারের দুর্নীতিবিরোধী জেহাদের নমুনা!

প্রধানমন্ত্রী যদি সরকারের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে এতটাই আস্থাশীল হন, তাহলে তিনি বিএনপির নেতা ও ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকার চ্যালেঞ্জটি নিলেন না কেন? খোকা বলেছিলেন, ‘সরকার তাঁর জনপ্রিয়তায় ভয় পেয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগ করছেন। তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কোনো প্রার্থী আওয়ামী লীগের নেই। এত বড় একটি দল, এত নেতা, এত মন্ত্রী, এত উপদেষ্টা—ঢাকার মেয়রের এই চ্যালেঞ্জটি নিতে পারলেন না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাগ করছেন। সিটি করপোরেশন ভাগ করলেই যে মানুষ সেবা পাবে, সেই ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হলেন কীভাবে? নগরবাসীর অধিকাংশ সেবা, যেমন—গ্যাস, বিদ্যু ৎ, পানি—এসব তো সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। সিটি করপোরেশনের হাতে আছে রাস্তাঘাটের সংস্কার, রাস্তার বাতি জ্বালানো, পরিচ্ছন্নতা ও মশা মারা। আগে সিটি করপোরেশনের কর্মপরিধি ঠিক করুন। স্থানীয় সরকারের হাতে অন্তত কিছু ক্ষমতা ন্যস্ত করুন। 

জনমত উপেক্ষা করে সরকার ঢাকা সিটি করপোরেশন ভাগ করেছে। গতকাল জাতীয় সংসদে আইন পাস হয়েছে। ৪০০ বছরের রাজধানীর কথা না হয় বাদই দিলাম, ১৫০ বছরের পৌরসভাকে বিভক্ত করার বদনাম কেন সরকার নিজের কাঁধে নিল? যুক্তরাজ্যে মার্গারেট থ্যাচার এ কাজ করে নিন্দিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশে নন্দিত হওয়ার সুযোগ নেই। প্রস্তাবিত আইনে তিন মাসের জন্য অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। সেই তিন মাসে নির্বাচন করা গেলে আগের জন বাদ দিয়ে নতুন প্রশাসক আসবেন। পাঁচ বছর এভাবে চালাতে পারলে ২০ জন প্রশাসক পাবে।

অনির্বাচিত সরকারের দোহাই দিয়ে ক্ষমতাসীনেরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছেন। আবার সিটি করপোরেশনগুলোতে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করতে চাইছেন। জেলা পরিষদে অনির্বাচিত দলীয় লোক বসানোর পাঁয়তারা করছেন। এসব কিসের আলামত? একেই বলে যখন যেমন সুবিধার গণতন্ত্র। সরকার বিএনপির বিরুদ্ধে হাজারটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে, দলবিলীন হয়ে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণীও করেছেন কোনো কোনো মন্ত্রী। বলেছেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপির আসন আরও কমে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কৌশল করলে নাকি সংসদে বিরোধী দলের অবস্থানও বিএনপির থাকত না। এত সব বড় চ্যালেঞ্জ প্রদানকারী মহাক্ষমতাধর দলটি ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকার ছোট্ট একটি চ্যালেঞ্জ নিতে পারল না! 

ঘরোয়া আলোচনায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন নামকরা অধ্যাপককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বড় বিপদ কী? তিনি মুহূর্ত বিলম্ব না করে বললেন, ‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা।’ কেন এটি বিপদ হিসেবে দেখছেন? তিনি জবাব দিলেন, ‘এ পর্যন্ত যেসব সংসদে ক্ষমতাসীনেরা দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে, তাদের কারও পরিণাম ভালো হয়নি। দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেশে কারও মাথা ঠিক থাকে না।’

সোমবার প্রথম আলোর অনলাইনে ঢাকার বিদায়ী মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সাক্ষা ৎকারটি পড়ছিলাম। তিনি দাবি করেছেন, দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে আওয়ামী লীগের সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আগে বিএনপিরও হয়েছিল। বিএনপি ক্ষমতা হারিয়েছে বলেই আজ সেই কঠিন সত্যটি স্বীকার করেছেন সাদেক হোসেন খোকা। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালে সেই দলের কোনো সাবেক মন্ত্রী ও নেতাও হয়তো এভাবে ভুল স্বীকার করবেন।
আমরা সেই সুদিন বা দুর্দিনের অপেক্ষায় আছি।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net


সুত্রঃ প্রথম আলো, ৩০ নভেম্বর, ২০১১

মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১১

অঙ্গভঙ্গি বুঝবে অ্যাপলের নতুন আইটিভি

টেক জায়ান্ট অ্যাপল ‘আইটিভি’ নামে নতুন টেলিভিশন তৈরি করছে বলে তথ্য দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের এক প্রযুক্তি বিশ্লেষক। নতুন এ টেলিভিশনে এক্সবক্স গেমিং কনসোলের মতো জেশ্চার বা অঙ্গভঙ্গি বুঝতে পারার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। খবর ডেইলি মেইল-এর।

জেশ্চার প্রযুক্তিটি পরিচালক এবং নির্মাতা স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘মাইনোরিটি রিপোর্ট’ ছবিতে দেখানো হয়েছিলো। পরে কাইনেক্ট ডিভাইসে এমন প্রযুক্তি আনে মাইক্রোসফট। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমেও এমন প্রযুক্তি আনার কথা মাইক্রোসফট ভাবছে বলে বাজারে গুজব রয়েছে। তবে, প্রযুক্তিবিশ্লেষকের দাবী, অ্যাপল কর্তৃপক্ষ টিভিতে যে প্রযুক্তি আনছে তার ব্যবহার গেমিং কনসোলের চেয়েও বেশি হবে।

আইটিভিতে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে টিভির সামনে কোনো দর্শক মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি করলে টিভি সেটা বুঝতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিবিশ্লেষক পিটার মিসেক জানিয়েছেন, নতুন প্রযুক্তির এমন টিভি তৈরির পরিকল্পনা করে গেছেন অ্যাপলের প্রয়াত সিইও স্টিভ জবস। তার বায়োগ্রাফিতেও এমন ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন তিনি।’

আগামী বছরই অ্যাপল আইটিভি বাজারে আনতে পারে বলেই ধারণা করছেন পিটার।

বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১১

স্যামসাংয়ের বৈদ্যুতিক বাতি চলবে ৩৬ বছর

কোরিয়ান ইলেকট্রনিক জায়ান্ট স্যামসাং সম্প্রতি বৈদ্যুতিক বাতি তৈরি শুরু করছে। স্যামসাং কর্তৃপক্ষের দাবী, নতুন প্রযুক্তির এ বৈদ্যুতিক বাতি ৩৬ বছর পর্যন্ত টিকবে। খবর ডেইলি মেইল-এর।

স্যামসাং জানিয়েছে, তাদের তৈরি এলইডি বাতিগুলো ৪০ হাজার ঘন্টা পর্যন্ত আলো দেবে যা সাধারণ বৈদ্যুতিক বাতির তুলনায় ৪০ গুন বেশি সময়। স্যামসাং-এর দাবী, সাধারণ হিসেবে ৪০ গুন হলেও প্রায় ৩৬ বছর পর্যন্ত এ বাতির আয়ু হবে।

স্যামসাং কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এলইডি টেলিভিশন তৈরিতে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় এ বাতি তৈরিতে সে প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণ এলইডি বাতিগুলোর চেয়ে স্যামসাং এর বাতিগুলোর পার্থক্য হয়েছে এর দীর্ঘস্থায়িত্ব।

স্যামসাং হোম অ্যাপ্লায়েন্স এর ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ডেক্সটার জানিয়েছেন, ‘সাধারণ বাতি হচ্ছে সাধারণ বাতিই। কিন্তু স্যামসাং-এর ডিজিটাল প্রযুক্তির বাতিতে যে এলইডি চিপ, ড্রাইভার বা ইলেকট্রনিক্স ব্যবহার করা হয়েছে তাতে এটি দীর্ঘস্থায়ী বাতি হিসেবে টিকে থাকবে। এ ছাড়াও এ বাতি পরিবেশবান্ধব।’

জানা গেছে, এ বৈদ্যুতিক বাতি তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের ইডেন পার্ক নামের একটি কোম্পানি কাজ করছে। এ কোম্পানি ‘প্লাজমা লাইটিং’ নামের যে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে সে প্রযুক্তিটি বাতিতে ব্যবহৃত হয়েছে। এ প্রযুক্তিতে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের দুটি শিটের মাঝে কাগজের চেয়েও পাতলা প্লাজমা স্তর ব্যবহৃত হয়। প্লাজমা স্তর হচ্ছে শক্তিসাশ্রয়ী এবং পাতলা প্রযুক্তিতে আলোর প্রযুক্তি। নমনীয়, সাদা এবং রঙিন আলো তৈরি করবে এ প্রযুক্তির বাতি।

তথ্য সত্রঃ এখানে

মঙ্গলবার, ২২ নভেম্বর, ২০১১

এভাবে ভালোবাসা হয় না

আমি রবীন্দ্রসংগীতই বেশি শুনি। তবু বাংলাদেশের আধুনিক গানের অ্যালবাম নিয়মিত কিনি। এখন যেমন শুনছি নির্বাচিতা। প্রিন্স মাহমুদের কথা আর সুরের গান। এই অ্যালবামের প্রথম গানের কথাটা আমার মনে ধরেছে। দুই দিন ধরে সারা দিন এই গানটাই গুনগুন করছি। এমনকি গতরাতে আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে এই লাইন দুটো: দু পা আমি এগিয়েছি, দু পা তুমি পিছিয়েছ, এভাবে ভালোবাসা হয় না।
এই গানের কথাটা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে আমার মনে হচ্ছে। আর আমি ঘুমের মধ্যে বলে উঠছি, এভাবে ভালোবাসা হয় না। 

সামপ্রতিক প্রসঙ্গ অবশ্যই টিপাইমুখ বাঁধ। কিন্তু এই কথাটা হয়তো সার্বিকভাবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের চড়াই-উৎরাই নিয়েই বলা যাবে।

আবার সামপ্রতিক বাংলা গান থেকেই উদাহরণ দিতে হচ্ছে। কৃষ্ণকলির গানের লাইন আছে, দিয়েছি তো যা কিছু দেবার।

বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে আশা করা গিয়েছিল, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটা সোনালি যুগে প্রবেশ করল। ভারতের প্রধান উৎকণ্ঠা ছিল তাদের নিরাপত্তা। সন্ত্রাসবাদ, উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা—এসব মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাহায্য তারা কামনা করেছিল সবচেয়ে বেশি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ যদি তাকে উদারভাবে, আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করে, তবে বাংলাদেশের জন্য সাহায্য-সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের হাত নিঃশর্তভাবে তারা এগিয়ে দেবে, এই রকমই একটা ধারণা আমরা পেয়ে আসছিলাম বহুদিন ধরে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে দু পা নয়, কয়েক পা এগিয়ে গেছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা চলছে প্রকাশ্যে। কোনো রকমের ছাড় দেওয়ার ইচ্ছা বাংলাদেশের নেই, তা স্পষ্টতই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে সর্বমহলকে। বাংলাদেশের মাটিকে কোনো দেশের বিরুদ্ধেই সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহূত হতে দেওয়া হবে না, এই প্রকাশ্য ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সজাগ আর সক্রিয় রয়েছে। ভারতের আরেকটা বড় চাওয়া হলো ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট। ভারতের পূর্ব-অঞ্চলের জন্য মাল পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের জল-স্থল ব্যবহার করতে দেওয়া। এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে কি হয়নি, কূটনীতিকেরা, আইনজ্ঞরা তা ভালো বলতে পারবেন, আমরা চর্মচক্ষে যা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতে মালামাল পরিবাহিত হচ্ছে। বাংলাদেশের নদী, নৌবন্দর, সড়কপথ ভারতীয় পণ্য পরিবহনে ব্যবহূত হচ্ছে (হোক তা পরীক্ষামুলক)। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বহুল প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা চুক্তি হতে পারেনি। তখন আমরা বলেছিলাম, তিস্তার পানি না পেলে ট্রানজিট নয়। যদিও এই তর্ক আছে, অনেকেই বলছেন, অভিন্ন নদীর পানি বাংলাদেশের ন্যায্য প্রাপ্য, এটা অধিকার; ট্রানজিট অধিকার নয়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে দেওয়া সুবিধা। এর আগেরবার যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল, তখন শুনেছিলাম, ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আয় করতে পারবে। এখন সে বিষয়ে আর খুব উচ্চবাচ্য শুনি না।

আমার যদি লাভ না হয়, কিন্তু পড়শির উপকার হয়, নিজের ক্ষতি না করে তা করতে দিতে আমি রাজি। পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি জীবন মন সকলি দাও, তার মতো সুখ আর কোথা আছে আপনার কথা ভুলিয়া যাও। কিন্তু পরের সুখের কারণে নিজেকে কতখানি মূল্য দিতে হবে, তার একটা পরিমাণ জানা থাকা চাই। আমাদের দেশের দুর্বল অবকাঠামোর ওপর দিয়ে ভারতের ট্রাক চলবে, বিপুল ভারবাহী লরির চাপ সইতে না পেরে সেতু আর্তনাদ করে উঠবে, সেতুর নিচে বার্জ আটকে যাবে, কার্বনদূষণ ঘটবে, পরিবেশদূষণ ঘটবে, যানজট হবে, বিনিময়ে কিছুই পাব না? 

তবু, তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন। আমরা দিয়ে চলেছি। বিনিময়ে এই কি আমাদের প্রাপ্য ছিল? বাংলাদেশকে না জানিয়ে টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করে ফেলল মণিপুর রাজ্য সরকার। অথচ কানে বাজছে মনমোহনের মোহন বাণী—বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কিছুই করবে না ভারত।
টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষেই মত আছে, আমরা জানি। পক্ষের মতটা হলো, বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা হবে, ফলে ভাটিতে আর বন্যা হবে না। শুকনো মৌসুমে সেই জল ছেড়ে দেওয়া হবে, ফলে শীতকালে সেচ দেওয়া যাবে। এ থেকে বাংলাদেশও বন্যা ও খরার প্রকোপ থেকে বাঁচতে পারবে। আর এর বিপক্ষের যুক্তিগুলো খুবই শক্ত। এক. এই এলাকাটা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। হঠাৎ করে ভূমিকম্প হলে ভাটি অঞ্চল প্রবল বন্যার জলে ভেসে যাবে। অবশ্য সেই ক্ষতি ভারতের ২০০ কিলোমিটার নদীতীরবর্তী অঞ্চলেও হবে। দুই. টিপাইমুখ প্রকল্প কেবল বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, সেচ প্রকল্পও বটে। তাহলে ভারত পানি প্রত্যাহার করবে। ফলে এই নদীর অববাহিকায় এত দিন যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হতো, তার ব্যত্যয় ঘটবে। 

এমনিতেই, বিদ্যুৎ প্রকল্প হলেও বর্ষাকালে যে উচ্চতায় পানি আসত, তা আসবে না। আবার শীতকালে হয়তো বেশি আসবে। তার মানে হাজার বছর ধরে এই এই অঞ্চল প্রকৃতির যে চক্রে অভ্যস্ত হয়ে আছে, তাতে ছেদ ঘটবে। প্রকৃতির ওপর হাত দেওয়া কোনো দিনই আখেরে সুফল আনে না। এটা অববাহিকা অঞ্চলের মানুষ, কৃষি, মাছ, গাছপালা, লতাপাতা, ভূপ্রকৃতি, নৌপরিবহন, নাব্যতা, জীব বৈচিত্র্য, লবণাক্ততা, না-লবণাক্ততার ওপর কী প্রভাব ফেলবে আমরা তা জানি না। এই জন্যই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্প করার আগে বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে যৌথ সমীক্ষা হোক। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর যদি দেখা যায়, অপকারের চেয়ে উপকারই বেশি, তাহলে এটা মেনে নিতে আমাদের দিক থেকে কোনো আপত্তির কিছু নেই। আর যদি দেখা যায়, এতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়, তাহলে মনমোহন সিংয়ের উক্তির বাস্তবায়নই কাম্য: বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কিছুই ভারত করবে না।
সেই যৌথ সমীক্ষা করা হলো না। টিপাইমুখ নিয়ে কেবল বাংলাদেশে নয়, ভারতে, প্রকল্প এলাকায়, এমনকি সারা পৃথিবীতে পরিবেশবিদ ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগী মানুষ এবং সাধারণ মানুষ প্রতিবাদমুখর। সেসব উপেক্ষা করা হলো। একটা চুক্তি করা হলো, যে বিষয়ে বাংলাদেশকে জানানোর কথাও ভাবল না ভারত।

দু পা নয়, অনেক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। দিয়ে দিয়েছে, যা কিছু দেওয়ার। কিন্তু ভারত পিছিয়েছে তারও চেয়ে বেশি। এভাবে ভালোবাসা হয় না। ভালোবাসা একপক্ষে হয় না। জোর করেও হয় না। এসব ভাবতে ভাবতে আমার রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটল। এর মধ্যে শুনতে পেলাম, বাংলাদেশের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, টিপাইমুখ বাঁধ ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীর উজানে একটা দেশ একপক্ষীয়ভাবে বাঁধ দিচ্ছে, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার? বলেন কী ভদ্রলোক!

এই লেখা শুরু করেছিলাম রবীন্দ্রনাথের নাম পেড়ে। শেষ করি তাঁর লেখা মুক্তধারা নাটক দিয়ে। কিছু সংলাপ তুলে দিচ্ছি, বক্তার নামছাড়া।
‘আমার বাঁধ সম্পূর্ণ হয়েছে।’
‘শিবতরাইয়ের প্রজারা এখনো এ খবর জানে না। তারা বিশ্বাসই করতে পারবে না যে, দেবতা তাদের যে জল দিয়েছেন কোনো মানুষ তা বন্ধ করতে পারে।’
‘দেবতা তাদের কেবল জলই দিয়েছেন, আমাকে দিয়েছেন জলকে বাঁধবার শক্তি।’
‘তারা নিশ্চিন্ত আছে, জানে না আর সপ্তাহ পরেই তাদের চাষের খেত—’
‘চাষের খেতের কথা কী বলছ?’
‘সেই খেত শুকিয়ে মারাই কি তোমার বাঁধ বাঁধার উদ্দেশ্য ছিল না?’...
এই নাটকের শেষে যুবরাজ সেই বাঁধ ভেঙে দিয়ে তারই জলে ভেসে যায়। এই নাটকের অন্য অনেক মানে আছে, এখন আমাদের কাছে, আমরা যারা সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনার স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়ে চিন্তিত, তাদের কাছে মুক্তধারা নাটকের মানে এই যে প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো থাকতে দাও, তাকে রুদ্ধ করার চেষ্টা কোরো না। এটা আমাদের চাওয়া, আমাদের বার্তা। কিন্তু ভারত আমাদের কথা শুনবে, এই রকম কোনো লক্ষণ নেই। তাহলে?


আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।




সুত্রঃ প্রথম আলো, ২২ নভেম্বর, ২০১১

সোমবার, ২১ নভেম্বর, ২০১১

ভারতের একতরফা উদ্যোগ অগ্রহণযোগ্যঃ টিপাইমুখ বাঁধ

বাংলাদেশের ক্ষতি হবে, এমন কোনো প্রকল্প টিপাইমুখে না করার আশ্বাস দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এ আশ্বাসের পর স্বাভাবিক আশা ছিল, ভারত টিপাইমুখে যা-ই করুক তা বাংলাদেশকে জানিয়ে করবে। ভারত সে পথ ধরেনি। বাংলাদেশকে অন্ধকারে রেখে টিপাইমুখে বাঁধ ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে ফেলেছে। ফলে একদিকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে অভিন্ন নদীতে কোনো প্রকল্প করার ক্ষেত্রে যে আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি মেনে চলতে হয়—দুটোই উপেক্ষিত হলো।

টিপাইমুখে বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশেই পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই প্রকল্প ক্ষতিকর হবে কি না বা কতটুকু ক্ষতিকর হবে, সমীক্ষার পর এর পুরো চিত্র পাওয়া যাবে। কিন্তু ভারতের এই প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা রয়েছে, যা ভারত কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারে না। অভিন্ন কোনো নদীতে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হলে নদীর পুরো অববাহিকার ওপর এর কী প্রভাব পড়বে সে নিয়ে যৌথ সমীক্ষা প্রয়োজন। এ ধরনের সমীক্ষা ও যৌথ অববাহিকার অন্য কোনো দেশের (টিপাইমুখের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের) উদ্বেগের বিষয়টি নিষ্পত্তি না করে কোনো প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ নেই। অতএব, টিপাইমুখে বাঁধ ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে গত ২২ অক্টোবর যে বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে, তা অগ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি-নীতির লঙ্ঘন। আর কূটনৈতিকভাবেও এই আচরণ সুপ্রতিবেশীসুলভ তো নয়ই। আমরা ভারতের এই আচরণ ও উদ্যোগের প্রতিবাদ জানাই। 

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক নতুন মোড় নিয়েছে। যেকোনো দুটি দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল যে বিষয়টি কাজ করে তা হচ্ছে পারস্পরিক স্বার্থ। বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে এ স্বার্থরক্ষার কাজটি হয়ে থাকে। এটা সবারই জানা যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল নিরাপত্তা। ভারতের চাওয়া ছিল, সন্ত্রাসবাদ ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে বাংলাদেশ সহায়তা করুক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের উদ্বেগ পুরো দূর করেছে। ভারতের আরেকটি চাওয়া হচ্ছে ট্রানজিট। আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও অনানুষ্ঠানিক বা ‘পরীক্ষামূলক’ নামে তাও চালু হয়েছে। অন্যদিকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে অভিন্ন নদীর পানি বন্টন ছিল বাংলাদেশের দাবি। পানি পাওয়ার বিষয়টি যৌথ অববাহিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার। আমরা দেখেছি যে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েও ভারত এখনও পর্যন্ত তা করেনি। এখন দেখা গেল, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও বাংলাদেশকে না জানিয়ে টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণে ভারত আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে ফেলেছে। ভারতের একতরফা উদ্যোগটি দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার সুসম্পর্কের অন্তরায় বলে মনে করি। 

আমরা আশা করব, ভারত টিপাইমুখে বাঁধ ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের এই একতরফা উদ্যোগ থেকে সরে আসবে। দুই দেশের যৌথ সমীক্ষা এবং বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকবে।


সুত্রঃ প্রথম আলো, ২১ নবেম্বর, ২০১১

টিপাইমুখ: সরকারের ভূমিকা উদ্বেগজনক

টিপাইমুখ ড্যাম নির্মাণ বিষয়ে একের পর এক বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করে চলেছে ভারত। ২২ অক্টোবর ড্যামটি নির্মাণের জন্য একটি যৌথ বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে সেখানে। এ ধরনের চুক্তি করার আগে বাংলাদেশকে জানানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা মানেনি ভারত। দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির ৯ নম্বর ধারা অনুসারে, একতরফাভাবে কোনো যৌথ নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ না থাকলেও একের পর এক তা করে চলেছে ভারত।

নিজ দেশের স্বার্থের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়নি বাংলাদেশ। এমনকি কখনো ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির অধীনে ভারতের দায়দায়িত্বের প্রসঙ্গও ভারতের কাছে উত্থাপন করেনি। বরং ভারতের মন্ত্রীদের প্রায় অবিকল ভাষায় বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও বলছেন এ প্রকল্পে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না! উজানের দেশে টিপাইমুখের মতো একটি দৈত্যাকৃতির জলাধার নির্মাণ ভাটির দেশে কোনো ক্ষতি করবে না—এটি স্বয়ং ভাটির দেশই বলছে—এই নজির সারা বিশ্বে আছে বলে আমার জানা নেই। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের ভূমিকা শুধু নতজানুমূলক নয়, একই সঙ্গে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
২. 
টিপাইমুখ বা অন্য কোথাও অভিন্ন নদীতে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তিটিই হচ্ছে দুই দেশের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক আন্তর্জাতিক আইন। কারণ এই চুক্তিতে শুধু গঙ্গা নদীর পানি ভাগাভাগির কথা বলা হয়নি। এর ৯ নং অনুচ্ছেদে ‘ন্যায়পরায়ণতা (ইকুইটি), ন্যায্যতা (ফেয়ারনেস) এবং কারও ক্ষতি নয় (নো হার্ম)’—এসব নীতির ভিত্তিতে দুই দেশের সরকার অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগির জন্য চুক্তি সম্পাদন করতে একমত হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে, বাংলাদেশের সঙ্গে অবাধ তথ্যবিনিময়, আলোচনা এবং চুক্তি না করে ভারত কর্তৃক অভিন্ন নদীর ওপর এককভাবে প্রকল্প গ্রহণের কোনো বৈধতা নেই। আবার চুক্তিতে উল্লিখিত নো হার্ম নীতি অনুসারে টিপাইমুখের মতো কোনো প্রকল্প নির্মাণ করতে হলে অববাহিকাভিত্তিক যৌথ সমীক্ষা করার দায়দায়িত্ব ভারত কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পানিবিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত সম্প্রতি বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোনো যৌথ পরিবেশ সমীক্ষা ছাড়া টিপাইমুখ বাঁধ ভারত নির্মাণ করতে পারে না। 

দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছাড়াও আন্তর্জাতিক কিছু পরিবেশ চুক্তি রয়েছে যেগুলোর পক্ষরাষ্ট্র বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ই। এসব চুক্তি (যেমন ১৯৯২ সালের বায়োডাইভারসিটি কনভেনশন, ১৯৭২ সালের ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কনভেনশন, ১৯৭১ সালের ওয়েটল্যান্ড কনভেনশন) অনুসারে, একতরফাভাবে টিপাইমুখের মতো প্রকল্প গ্রহণের অধিকার ভারতের নেই। আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে: প্রতিবাদ করার পক্ষে বহু এমন চুক্তি ও যুক্তি থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার এখনো সহায়-সম্বলহীনের মতো নির্ভর করে আছে ভারতের আশ্বাসের ওপর। অতীতের কথা বাদ দিই, এই সরকারের আমলেই সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা, তিস্তা চুক্তি সম্পাদনের মতো অনেক প্রতিশ্রুতি একের পর এক লঙ্ঘন করেছে ভারত। সরকারের টনক নড়ছে না যেন তবু!

৩.
একতরফাভাবে টিপাইমুখ প্রকল্প নির্মিত হলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না বলে ভারত যে আশ্বাস দিচ্ছে, তা শুধু আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্যই নয়, এটি বিভিন্ন কারণে অবিশ্বাস্যও।
প্রথমত, ওয়ার্ল্ড কমিশন অন ড্যামের ২০০০ সালে প্রকাশিত ড্যাম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক সুবিশাল গবেষণা রিপোর্টে বড় ড্যাম লাভের চেয়ে ক্ষতি অনেক বেশি করে, পরিষ্কারভাবে এ কথা বলা হয়েছে। শুধু পরিবেশগত দিক দেখলে এসব ক্ষতির মধ্যে রয়েছে বন ও বন্য প্রাণীর ক্ষয়ক্ষতি, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গতকরণ, প্রাণীবৈচিত্র্য বিনষ্টকরণ ও পানির মান (কোয়ালিটি) বিনষ্টকরণ। কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়, এসব ক্ষতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে অমেরামতযোগ্য এবং এ কারণে কিছু দেশ, বিশেষ করে আমেরিকা, এরই মধ্যে নির্মিত বড় ড্যামগুলো ভেঙে ফেলছে। সামাজিক প্রভাবসংক্রান্ত অংশে কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বড় ড্যামের কারণে বিশেষ করে উজান অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা এবং স্বাস্থ্যের মারাত্মক এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয়।

দ্বিতীয়ত, ভারতের এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্বয়ং মনিপুর ও মিজোরামের মানুষ সোচ্চার হয়েছিল এর মারাত্মক পরিবেশগত প্রভাবের কথা বিবেচনা করে। মনিপুরের রাজধানী ইমফলে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে ২০টি অরাজনৈতিক সংগঠনের ডাকে হরতাল পালিত হয়েছে, আদালতে মামলা করা হয়েছে এবং এখনো নিয়মিত প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আরও উজানের একটি দেশ হিসেবে এ প্রকল্পের ক্ষয়ক্ষতি বাংলাদেশেই বেশি অনুভূত হওয়ার কথা।
তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা। ফারাক্কা ব্যারাজ হলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না—এই দাবি ভারত ১৯৫১ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত আমাদের অব্যাহতভাবে শুনিয়ে এসেছে। ১৯৭৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভারত ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের কিছু সুবিধা হবে—এই দাবিও করেছে। ফারাক্কা ব্যারাজের অপূরণীয় ক্ষতির তিক্ত অভিজ্ঞতার পর টিপাইমুখ ড্যাম ক্ষতিকর হবে না, ভারতের এই দাবি অন্ধের মতো মেনে নেওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

বরাক নদীর ওপর টিপাইমুখ ড্যম নির্মাণসহ তিস্তা, গঙ্গা, দুধকুমারী, খোয়াই, মনু, মুহুরী, ধরলাসহ বিভিন্ন যৌথ নদীর ওপর ভারত একতরফাভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। তবে টিপাইমুখের আয়তন ও ব্যাপ্তি হবে এর মধ্যে সবচেয়ে বিশাল। ভূকম্পন এলাকায় অবস্থিত বলে এটি কখনো ভেঙে পড়লে তলিয়ে যেতে পারে সুরমা ও কুশিয়ারার দুই কূলের বিশাল অঞ্চল।
টিপাইমুখ ড্যামের সঙ্গে সঙ্গে ফুলের তল ব্যারাজ নির্মিত হলে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি ফারাক্কাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফুলের তল ব্যারাজ নির্মাণের কথা ভারতের আদি প্রস্তাবে রয়েছে। এটি যে এখন তার প্রকল্পের অংশ নয়, সে সংক্রান্ত কোনো দলিল-দস্তাবেজ বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই। আমাদের একটি বড় উদ্বেগ এটিও।

৪.
টিপাইমুখ ড্যাম প্রজেক্টের বিষয়ে বাংলাদেশকে তাই অবিলম্বে সরকারিভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে। এ প্রকল্পসংক্রান্ত সব সমীক্ষা, প্রতিবেদন ও প্রকল্পপত্র বাংলাদেশকে দেওয়ার জোর অনুরোধ ভারতকে জানাতে হবে। সব কাগজপত্র যৌথ নদী কমিশন, পানি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ক্ষয়ক্ষতি যথাসম্ভব কমিয়ে এনে (যেমন: টিপাইমুখ ড্যামের পরিবর্তে অনেকগুলো ছোট আকৃতির ড্যাম নির্মাণ করে এবং ফুলের তলে ব্যারাজ নির্মাণ পরিকল্পনা বাতিল করে) প্রকল্পের সুবিধা (যেমন: বিনা মূল্যে বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট পরিমাণ জলবিদ্যুৎ দিয়ে) আদৌ বাংলাদেশ সুনিশ্চিতভাবে পেতে পারে কি না, সেটিও আমাদের দক্ষতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এ বিবেচনা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে ভারতকে এই প্রকল্পের বিষয়ে সব কাজকর্ম বন্ধ রাখার দাবি সরকারকে করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার এসব করবে কি না, এই উদ্বেগ আমাদের থাকছেই।

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সুত্রঃ প্রথম আলো, ২১ নভেম্বর ২০১১ 

শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১১

এটিএম বুথে জাল টাকা! ''চিন্তার কারণ আছে ''


প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আসসালামু ওয়ালাইকুম। আশা করি সকলে ভাল আছেন। আজ আমি আপনাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে হাজির হয়েছি। তাহলে আবার মূল কথায় আসি।

আমাদের চলমান জীবনে সমস্যার কোন শেষ নেই, দিন কে দিন সমস্যার পরিমান বাড়ছে বৈ কি কমছে না। তেমনি এক নতুন সমস্যা হল ATM বুথে জাল টাকা। সম্প্রতি এমন অনেক গুলো ঘটনা ঘটলেও তার কোন সুরাহা হয় নি।

সম্প্রতি আমারই এক ক্লাস মেট ডাচ বাংলার এটিএম বুথ থেকে ২ হাজার টাকা তোলে কিন্তু তার মধ্যে ৫০০ টাকার একটি জাল নোট পায়। সাথে সাথে নিকটস্থ  শাখায় যোগাযোগ করলে ব্যাংকের ম্যানেজার বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং তিনি জানান তাদের বুথ গুলোতে জাল টাকা থাকার প্রশ্নেই আসেনা। তাহলে আমার প্রশ্ন এই জাল টাকা কি হাওয়ায় উড়ে এলো? শুধু ডাচ বাংলা ব্যাংক নয় অভিয়োগ আছে ব্র্যাক ব্যাংক সহ আরও বেশ কয়েকটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে।

এমন ঘটনা আরও ঘটেছে যা আমরা পত্র পত্রিকায় দেখেছি। এটিএম বুথ থেকে জাল টাকা পেয়েছেন এমন অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকে অভিযোগ করতে গেলে উল্টো জাল টাকার ব্যবসায়ী বলে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয়েছে। কাউকে কাউকে অপমান করে ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

জানা গেছে, জাল টাকার সিন্ডিকেট গুলো বিভিন্ন ব্যাংক গুলোকে জাল টাকা ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। ব্যাংকের এক শেনীর কর্মকর্তাও এ সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত বলে জানা যায়। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গুলো অদৃশ্য কারনে এ ব্যপারে  নিরব ভুমিকা পালন করছে।

অতএব, সকলে সাবধান হবেন।  আধুনিক ডিজিটাল ব্যাংকিং এর সুয়োগে এক শেনীর অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তা আপনার হাতে ধরিয়ে দিবে জাল টাকা, তখন প্রমানের অভাবে আপনার কিছুই করার থাকবেনা, রাগে ক্ষোভে নিজের মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করবে কিন্তু কোন লাভ হবে না।

সকলে ভাল থাকবেন। সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করে আজ বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ হাফেজ। 

বৃহস্পতিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১১

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক: বিনিয়োগ করবে ব্যাংক, কালোটাকা নিয়ে প্রশ্ন করা হবে না -''ক্ষতি পোষানোর উদ্যোগ''

শেয়ারবাজার-পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল বুধবার রাতে চার ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে গতকাল সন্ধ্যা সাতটা ৪০ মিনিটে শুরু হওয়া বৈঠকটি চলে রাত প্রায় সোয়া ১১টা পর্যন্ত। 

বৈঠকে অনেকগুলো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বৈঠক শেষে এসইসির সদস্য আরিফ খান সাংবাদিকদের কয়েকটি সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগ-কারীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, পুঁজিবাজারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছেন। এ ছাড়া অপ্রদর্শিত অর্থ কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই বাজারে বিনিয়োগের বিষয়টি আবারও নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো সংস্থাই এ নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না।

সূত্র জানায়, বৈঠকে বাজার-পরিস্থিতির উন্নয়নে করণীয় বিষয়ে এসইসি প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি লিখিত প্রস্তাব জমা দেয়। দুপুরে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এসইসির চেয়ারম্যান তাঁদের সুপারিশ-গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। জানা গেছে, তাতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বাড়াতে বিধিবদ্ধ নগদ জমা (সিআরআর), বিধিবদ্ধ জমা (এসএলআর) হার কমানো, পুঁজিবাজারে ব্যাংকের আইনি বিনিয়োগসীমা (এক্সপোজার লিমিট) নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা, ব্যাংকের বিনিয়োগের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশনিং) ধাপে ধাপে করা এবং শেয়ারবাজার থেকে করা ব্যাংকের গত দুই বছরের মুনাফার অংশ আবার বিনিয়োগ করার সুপারিশ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে। 

আগামী শুক্রবার ও শনিবারের মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, এসইসি ও বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও বৈঠকে বসবে। তারপর আগামী সপ্তাহের শুরুতে সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। 

এর আগে শেয়ারবাজার-পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক করবেন—এই খবরে গতকাল বুধবার দুই বাজারেই মূল্যসূচক বেড়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী বাজারসংশ্লিষ্টদের নিয়ে ওই বৈঠকের উদ্যোগ নেন। আর তাতেই গতকাল দিনের শুরু থেকেই দুই স্টক এক্সচেঞ্জে মূল্যসূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল দিনশেষে সাধারণ মূল্যসূচক বেড়েছে প্রায় ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ বা ৩৩৮ পয়েন্ট। আর অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক বেড়েছে ৬ দশমিক ১৮ শতাংশ বা ৮২৭ পয়েন্ট।

লেনদেন শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যায়। একপর্যায়ে অনেক কোম্পানির শেয়ার বিক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। এ কারণে শেয়ারের লেনদেন কম হলেও তা সূচক বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুরের মধ্যেই লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে দেড় শতাধিক কোম্পানিই বিক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। ডিএসই থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, লেনদেন হওয়া শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে গতকাল আটটিই মূল্যবৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা (সার্কিট ব্রেকার) ছুঁয়েছে। 
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় ধরনের দরপতনের মধ্যে থাকার পর বাজারের এই আচরণ অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।

যোগাযোগ করা হলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, আমাদের বাজার এখনো ব্যক্তিশ্রেণীর সাধারণ বিনিয়োগকারীনির্ভর। তাই তাদের প্রতিদিনের আচরণের প্রভাব বাজারে দেখা যায়। শেয়ারবাজার-পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের খবরে বিনিয়োগকারীদের অনেকে নতুন করে আশাবাদী হয়েছেন। তাঁরা ভাবছেন, নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী বাজারের উন্নয়নে কিছু করবেন। তাই যেসব বিনিয়োগকারী লোকসানে শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ লোকসান পুষিয়ে নিতে আবারও শেয়ার কিনেছেন। আর কেউ কেউ লোকসান কমাতে নতুন করে দাম সমন্বয় করেছেন।

সালাহউদ্দিন আরও বলেন, শেয়ারের দাম ও বিনিয়োগকারীদের লোকসান যে পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে সামান্য আশার আলো দেখলেই বিনিয়োগকারীরা নতুন করে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এটি অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগ নেওয়ার পর অনেকেই হয়তো মনে করছেন, বাজার ঘুরে দাঁড়াবে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগে গতকাল সকালে এসইসি বাজার-পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

এবিবির সঙ্গে বৈঠকের পর দুপুরে এসইসির চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেন সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গেও বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে এসইসির চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয় নিয়েই অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

এদিকে, বাজারে মূল্যসূচক বাড়লেও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন বিনিয়োগকারীরা। গতকালও ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানীর মতিঝিলে ডিএসই ভবনের সামনের সড়কে সকাল থেকেই বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের ব্যানারে একদল বিনিয়োগকারী বিক্ষোভ করেছেন। এ কারণে ওই সড়কের এক পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সকাল থেকেই ডিএসই ভবনের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। 

ডিএসই ভবনের সামনের সড়কে যান চলাচলে যাতে বিঘ্ন না ঘটে, সেই বিষয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহল। এ সময় বিনিয়োগকারীরা তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। আর পুলিশের পক্ষ থেকে রাস্তা বন্ধ না রাখার আহ্বান জানানো হয়। এ ব্যাপারে একে অপরকে আশ্বস্ত করেন।

সুত্রঃ প্রথম আলো, ১৭ নভেম্বর, ২০১১ 

রবিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১১

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য-'' সুন্দরবনের পরাজয়ের পর''

আমরা, এবং কিছুটা ভারত, চেষ্টা করেছিলাম সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের একটি করার জন্য। পারলাম না। যে সাতটি নতুন স্থান নির্বাচিত হয়েছে সেগুলো হলো আমাজন নদী, ভিয়েতনামের হালং বে, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সীমান্তবর্তী ইগুয়াজু জলপ্রপাত, দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপ, ইন্দোনেশিয়ার কোমাডো জাতীয় উদ্যান, ফিলিপিনসের পুয়ের্তো প্রিন্সেসা নামের ভূগর্ভস্থ নদীটি, এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত টেবল মাউন্টেন বা টেবিল পর্বত। টিভি থেকে যতটুকু পর্বতটাকে দেখেছি ততটুকুতেই মনে হয়েছে, এটি শুধু প্রকৃতি প্রদত্ত একটি রাজকীয় ভোজসভার টেবিল নয়, এটার দাঁড়ানোর মধ্যে একটি ভয়ংকর সমীহ জাগানোর ব্যাপার আছে। 


সৌন্দর্য ও ভয়ংকরতা মিলে যা হয়, যাকে ইংরেজ কবি উইলিয়াম ব্লেইক ‘ফিয়ারফুল সিমেট্রি’ (ভয় জাগানিয়া সমন্বিত সৌন্দর্য) বলেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ‘টাইগার’ কবিতাটিতে, এবং যাকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘ভয়ংকর সুন্দর’ নামে অভিহিত করে একটি কিশোর উপন্যাস রচনা করেছিলেন, যে ভয়ংকর সুন্দরের উপস্থিতি আমরা প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত মিসরের মমি কিংবা পিসা নগরের হেলানো মন্দিরে দেখতে পাই, সে ভয়ংকর সৌন্দর্য সুন্দরবনকে প্রচারিত করার ক্ষেত্রে আমরা উপস্থিত করতে পারিনি বলে যুদ্ধে জিততে পারিনি। 


''প্রকৃতির কারনে নয়, সুন্দরবন হারল আমাদের উদাসীনতার দোষে''


শুধু নিপাট রোম্যান্টিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হলে সপ্তাশ্চর্যের তালিকায় টিকে থাকা মুশকিল; সে রকম হলে পৃথিবীর বহু জায়গা আছে, যেমন ক্যারিবিয়ান সমুদ্রের দ্বীপপুঞ্জগুলো যেখানে সাগরের নীল পানি, সাদা বালির সৈকত আর নারকেলগাছের সারির সঙ্গে বাঁধা হয়েছে মনোরম রিসর্ট, সেগুলোই পেয়ে যেত ভোট। সুন্দর চাখতে চাখতে একটু ভয় পেতে হবে, এই সংমিশ্রণটা না থাকলে প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত দাঁড়ানো যায় না। অনেকে হয়তো বলবেন, তাহলে ‘তাজমহল’ কীভাবে টিকে গেল? তার মধ্যে ভয়ের কী আছে? অন্যদের কথা বলতে পারব না, তবে আমি ‘তাজমহল’ মোট তিনবার দেখেছি, এবং প্রতিবারই অসম্ভব এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে বোধ করেছি মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ। আগ্রার খুব গরমের দিনেও, মে কিংবা জুন মাসে, আপনি তাজমহলের সমাধিসৌধের মূল চাতালে উঠে শুয়ে পড়ুন, দেখবেন শ্বেত মার্বেল পাথরের ঠান্ডা স্পর্শে আপনার গা জুড়িয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুর সময় সম্ভবত এ রকম গা জুড়িয়ে যাওয়ার খেলা থাকে। জানি না, জানব আর কী?


কিন্তু সুন্দরবন ভ্রমণে গেলে খাপছাড়াভাবে আপনি একটা নৈরাশ্যের শিকার হবেন। কারণ সাদামাটা পর্যটক হিসেবে গেলে আপনি কখনো সে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা ডোরাকাটা হলুদ বর্ণের বাঘমামার দেখা পাবেন না। বাঘমামা দূরে থাক, তার থাবার দাগও খুঁজে পাবেন না (হয়তো অনেকে জানেন, স্থানীয় বনবাসীরা বাঘকে বাঘ বলে না, বলে মামা)। বাঘ দেখতে চাইলে ওরা কৌতুক করে বলে, মামাকে দেখতে না পাওয়াই ভালো, কারণ ওইটাই হয়তো হয়ে যাবে শেষ দেখা। যে দেখায় জীবন চলে যেতে পারে সে ধরনের দেখার কথা বলছি না, বলছি বাঘ দেখার ব্যবস্থা থাকার কথা। সুন্দরবন চার দিনের প্যাকেজ টুরে ঘুরে এসে আপনার মনে হবে, সুন্দর নদী, খাল, খাঁড়ি ও বৃক্ষাবৃত প্রাকৃতিক নিসর্গে আপনি একটি পোস্টকার্ডের ছবির মতো জীবন যাপন করলেন। কিন্তু কোথাও কোনো ভয় ছিল না, কোনো ঝুঁকি ছিল না। সে জন্য সুন্দরবন ভ্রমণটা উন্নততর একটি পিকনিক মনে হয়, কিন্তু অ্যাডভেঞ্চার করলাম মনে হয় না। আবার আরেকটা উপায় আছে, সেটা হলো ক্যামেরা এবং বন্দুক নিয়ে, ভাতের মোচা বেঁধে রাতের পর রাত গাছে মাচা বেঁধে থাকা। গাছের নিচে একটা ছাগল বেঁধে রেখে তারপর বাঘমামার জন্য অপেক্ষা করা। ইদানীং সুন্দরবনের দৃশ্যাবলির ওপর ন্যাশন্যাল জিওগ্রাফিক ও ডিসকভারি চ্যানেল দুটো কি তিনটে ছবি বানিয়েছে, যেগুলো ওরা ঘুরেফিরে কিছুদিন পরপর দেখায়। চিত্রগ্রাহকদের বর্ণনায় বুঝতে পেরেছি, তাদের দীর্ঘ সময় ধরে রাতের পর রাত মাচা বেঁধে বনের ভেতর মশার কামড় খেয়ে থাকতে হয়েছে। তার পরও ছবিগুলোতে বাঘমামার উপস্থিতি তার খ্যাতির তুলনায় খুব কম। 

সুন্দরবন নিশ্চয় আফ্রিকার সেরেংগেটি, ক্রুগার, কালাহারি, ইতোশা বা সাহারা ন্যাশন্যাল পার্কের মতো অতটা ভয়ংকর বনাঞ্চল নয়। কিন্তু ওখানে বনের ভেতরে গিয়ে খুব কাছ থেকে পশুর রাজা সিংহ, পশুদলের ভিম গন্ডার, কিংবা পশুদলের খলনায়ক হায়েনা বা সুন্দরী লম্ফঝম্পের ওস্তাদিনী টমসন গ্যাজেল বা নিষ্পাপ চিত্রল হরিণী, কিংবা পশুর দলের জনতা ওয়াইল্ডার বিস্ট, কিংবা পাঁচ টনী হাতি, কিংবা করাত দাঁতওয়ালা নীল নদের কুমির, কিংবা জলহস্তি, সাপ, মনিটর প্রায় সবই গাড়ির কাচের নিরাপদ দূরত্বে থেকে অবলোকন করা যায়, ছবি নেওয়া যায়, গবেষণা করা যায়। জীবজন্তু, পক্ষিশ্রেণী, সরিসৃপ ও কীটপতঙ্গের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ ও দেখানোর জন্য পর্যটনবিজ্ঞানীরা এসব বনাঞ্চলের কর্তৃপক্ষের দেওয়া সব রকম সুযোগ-সুবিধার অকাতর ব্যবহার করেন। সিংহ যখন জিপের সামনে মুখ ব্যাদান করে হামলে পড়ে, কাচের ওপর আঁচড়ায় তখন ভ্রমণকারীদের শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়, তার পরও ভ্রমণকারীরা জানে যে এ ভয়টা নিছক ইন্দ্রিয়গত, যৌক্তিক ভয় না, এবং তাদের পাওনা হয়ে যাচ্ছে সারা জীবনের জন্য এক অনুপম অভিজ্ঞতা। তাই তাদের ভয় পাওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়, আবার ভয় থেকে বেরিয়ে আসার অভিজ্ঞতাও হয়। কিন্তু সুন্দরবন নিছক পর্যটক হিসেবে ঘুরে এলে মিরপুর চিড়িয়াখানায় বাঘের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে যে ভয়টা হয়, তার কণামাত্রও হয় না। ‘সুন্দরবনে গেলাম, অথচ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেখা পেলাম না’—এটি যখন মন্তব্যাকারে সপ্তাশ্চর্য বিচারকারী আন্তর্জাতিক কমিটির কাছে পৌঁছাবে, সেটিই বিশ্বজনমত হিসেবে তৈরি হবে এবং তখন সুন্দরবন নেতিবাচক প্রচারণার শিকার হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়বে, যা বস্তুত হয়েছেও। 


ভোটের হিসাবটা কী রকম জানি না। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ মিলে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ, সেখানে সুন্দরবন ভোট গণনায় হারতে পারে সেটা আমার মনে হয় না, মনে হয় হেরে গেছে ‘পর্যটন-প্রচারণা’, ‘ভ্রমণ-সুবিধা’ ও ‘ভৌগোলিক অবস্থানের দুর্গমতা বা সুগমতা’র বিবেচনায়।


এ পর্যায়ে আলাপে এসে যাচ্ছে আমাদের পর্যটনশিল্প নিয়ে কথাবার্তা। পর্যটনশিল্পের ভাষা হচ্ছে পোস্টকার্ডের উল্টোপিঠের ছবির মতো। যত পোস্টকার্ড, তত পরিচিতি। বিদেশে যেকোনো পর্যটনের জায়গা ঘুরতে গেলে পোস্টকার্ড অ্যালবাম কিনতে কিনতে হাত ভরে যায়। অথচ বিদেশি পর্যটকেরা বাংলাদেশ ঘুরতে এসে সুন্দরবনের পোস্টকার্ড কিনতে পারে কি না সন্দেহ। সুন্দরবনকে পর্যটকভোগ্য বা ভ্রমণ-উপযোগী করে তোলার জন্য এবং এর ভেতরের ভয়-জাগানিয়া ব্যাপারটাকে তুলে ধরার জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ দরকার। বলাবাহুল্য, এ আশকারার কোনো জায়গা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালচিত্রে আছে বলে মনে হয় না। দ্বিতীয়ত, ন্যাশন্যাল জিওগ্রাফিক বা অন্যান্য চ্যানেল কর্তৃক তৈরি ছবিগুলোর বেদনা আছে অন্য জায়গায়, বাঘ দেখানো নয়, মানুষ যে বন দখল করে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে, সেটি দেখানোয়। বস্তুত কোনো একটা ছবিতে এক জায়গায় এমন কথাও আছে যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রজাতিটি খেতে না পেয়ে তাদের স্বাভাবিক শারীরিক আয়তন হারিয়ে ফেলছে। আর বাঘ কর্তৃক নরদেহ শিকারের প্রতিটি ঘটনায় উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষ এসে বাঘের রাজ্যে ঢুকে পড়ছে বলে এ দুর্ঘটনাগুলো হচ্ছে। তাই এই ছবিগুলো যখন বিশ্ব চ্যানেলগুলোয় প্রদর্শিত হয়, তখন সুন্দরবন নিয়ে আমাদের অব্যবস্থাপনা ধরা পড়ে। 


ভৌগোলিক অবস্থানের সুগমতা ও দুর্গমতা নিয়ে একই কথা বলতে হয়। যোগাযোগ ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা ঠিক থাকলে বাঘের গুহার সামনে গিয়ে বাঘ দেখে নিরাপদে ফিরে আসা যায়। নায়াগ্রা জলপ্রপাতের বিশাল কান্না মানুষ কি কাছে গিয়ে শুনতে পারছে না! আমাদের ক্রিকেটারদের মুখে শুনেছি, জিম্বাবুয়ে গিয়ে তাঁরা ভিক্টোরিয়া ফলস (স্থানীয় ভাষায় ‘মোসোয়া টুন্যা’) দেখে আসতে পারেন। অথচ জিম্বাবুয়ে ও জাম্বিয়ার সীমান্তের মাঝখানে এ জলপ্রপাতটি পৃথিবীর একটি অতিদুর্গম খাঁড়ির মধ্যে অবস্থিত। শুধু তাই নয়, ওই খাঁড়িতে প্রবাহিত জাম্বেসি নদীর ওপর বাঙ্গি জাম্পিং বা পায়ে দড়িবেঁধে লাফ দিয়ে খরস্রোতা নদীর পানির ওপর দুলতে পারার ব্যবস্থাও নাকি আছে! ওই লাফটি দেওয়ার জন্য অবশ্য বুকের কলজের দরকার। 
সুন্দরবনে এ ধরনের অভিযাত্রিক হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। সুন্দরবন খুবই সুন্দর, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বা কক্সবাজারের চেয়ে সুন্দর হয়তো বা, কিন্তু এর যোগাযোগব্যবস্থা খুব দুর্বল এবং এর অপার সৌন্দর্য উপভোগ করার কোনো পর্যটনসুলভ ব্যবস্থাও নেই। অর্থাৎ প্রাকৃতিক কারণে নয়, সুন্দরবন হারল আমাদের উদাসীনতার দোষে। 




মোহীত উল আলম: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি, ইউল্যাব, ঢাকা
mohit_13_1952@yahoo.com


সুত্রঃ প্রথম আলো, ১৩ নভেম্বর, ২০১১

বৃহস্পতিবার, ১০ নভেম্বর, ২০১১

আমার দেখা সুন্দর একটি থিম!


আসসালামু ওয়ালাইকুম। আশা করি সকলে ভাল আছেন। আজ আপনাদের জন্য সুন্দর একটি মোবাইল থিম নিয়ে হাজির হলাম। আশা করি আপনাদের ভাল লাগবে। থিমটি সিম্বিয়ান মোবাইল সমর্থন করে।

নিচে স্ক্রীন শট দেয়া হল।







ডাউনলোড করার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

সকলে ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। শুভ কামনায় আজ বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ হাফেজ। 

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য- ''আসুন, ভালোবাসি এবং ভোট দিই''

বাচ্চা দুটো সদ্য খোঁড়া ছোট্ট দুটো কবর দেখিয়ে বলল, আমাদের ভাইবোনের কবর ওই দুটো। ওদের আঙিনায় তখনো প্রাইমারি স্কুলের বই, মাদুর বিছিয়ে তাতে বইগুলো ওরা শুকুতে দিয়েছে। এই দুটো বাচ্চা বেঁচে আছে উপকূলের গাছের ডাল ধরে। সেই যেবার সিডর হয়েছিল, সেবার সুন্দরবন এলাকায় গিয়ে এই দৃশ্য দেখেছিলাম। সেই থেকে আমি উপলব্ধি করতে পারি, সুন্দরবন আমাদের কত বড় রক্ষাকর্তা।


আমি জানি, প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচন নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। আয়োজক প্রতিষ্ঠানটার আসল উদ্দেশ্য বাণিজ্য। ওটা ঠিক জাতিসংঘের মতো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান নয়। যদিও ইউনেসকোর একটা অনুমোদন এদের আছে। এই দুনিয়ায় লাভ ছাড়া কেউ কিছু করে না। আমাদের বিবেচ্য, যদি সুন্দরবনকে আমরা ভোট দিয়ে সেরা প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যর তালিকায় আনতে পারি, আমাদের লাভ হবে নাকি ক্ষতি হবে। অবশ্যই লাভ হবে। প্রতিটি দেশই তার ইতিবাচক দিক তুলে ধরতে চায়। আমরা যে অলিম্পিকে সোনা জিততে চাই, সেই সোনার কীই-বা এমন দাম? বাজারে তো সস্তায় সোনার দলা পাওয়া যায়, কেন সবাই অনেক কষ্ট করে দল গঠন করে ট্রেনিং নিয়ে সোনার জন্যে ছোটে? কারণ দেশের নাম হয়। কেন আমেরিকা, ভারত, জার্মানি, ফ্রান্স পয়সা খরচ করে এই দেশে সাংস্কৃতিককেন্দ্র চালায়? তাদের দেশের ছবি দেখায়? পৃথিবীটা চলছে ব্র্যান্ডিংয়ের ওপরে। 


আমাদের দেশের ভাবমূর্তি খুব খারাপ। দুর্ভিক্ষের দেশ, বন্যার দেশ, সাইক্লোনের দেশ। সুন্দরবন যদি প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের একটা হয়, তাহলে আমরা সত্যি একটা নতুন পরিচয় তুলে ধরতে পারব। আমাদের গৌরব বাড়বে। আমরা যে বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা নিয়ে মাতামাতি করি, ওই মৌসুমে অন্তত চার-পাঁচজন বাংলাদেশি খেলার উত্তেজনায় মারা যান, কেন? একটা আনন্দ, একটা বিজয়ের গৌরব, একটা জয়-পরাজয়ের উত্তেজনা কাজ করে আমাদের মধ্যে। নইলে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হলেই কী, নাহলেই বা কী? মেসি আমার কে হয়? কিন্তু আমরা উত্তেজিত হই, কারণ তা আমাদের অর্থহীন নিরানন্দ জীবনকে আনন্দপূর্ণ করে তোলে। কাজেই ওই আনন্দকে কখনো আমি খারাপ চোখে দেখি না। তেমনি একটা প্রতিযোগিতা হচ্ছে, না হয় ধরেই নিলাম, খুব তুচ্ছ একটা প্রতিযোগিতা, একেবারেই কোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আয়োজিত নয়, তবু তো বাংলাদেশের সুন্দরবন তাতে আছে। আমরা কি চাইব না সুন্দরবন জয়লাভ করুক? এতে তো আমাদের কোনো ক্ষতি নেই। পৃথিবীর সব দেশই নিজের ইমেজ বৃদ্ধির জন্য অনেক টাকা খরচ করে। সুন্দরবনকে যদি জেতাতে পারি, সবচেয়ে কম টাকা খরচ করে বাংলাদেশের গৌরব বৃদ্ধি করা যাবে সবচেয়ে ভালোভাবে। এটা যদি এতই ফালতু হতো, তাহলে তাজমহলের জন্য ভারত কেন ভোট চেয়ে টিভিতে বিজ্ঞাপন দিল। আজকে তো নতুন সপ্তাশ্চর্যের তালিকায় তাজমহল স্বীকৃত ও গণ্য হয়ে গেছে।


সিডরের সময় আমি সুন্দরবন এলাকায় গিয়েছিলাম। গিয়েছিলাম আশার চরে। একটা বাড়িতে গেছি। একটা পরিবারের দুটো বাচ্চা ভেসে গেছে জলোচ্ছ্বাসে। আরও দুটো বাচ্চা বেঁচে আছে। মা বললেন, কীভাবে তাঁর হাত থেকে দুই সন্তানের হাত ছুটে গিয়েছিল। পরে বাচ্চা দুটোর লাশ পাওয়া যায় ভেসে যাওয়া ধানখেতে।


ওই মা আর তাঁর দুটো সন্তান বেঁচে ছিলেন গাছ ধরে। সুন্দরবনের গাছের ডাল ধরে।
আমি একটা ছোট্ট ছড়া লিখেছি সুন্দরবন নাম দিয়ে:

সুন্দরবন

সন্তান: ‘সমুদ্রজল নোনা কিন্তু চোখের মতো শান্ত কেন নয়?’
মা: ‘বাছা তোরা জানতি যদি আমার বুকেও সমুদ্রঝড় বয়!’

সন্তান: ‘তুফান যখন আসে তখন সমুদ্র কি দৈত্য হয় গো মা?
ঝরা পাতার মতোন ওড়ায় ঘরদোর আর ডোবায় যখন গাঁ!
ভাইয়া যখন ভেসে গেল ভেসে গেল যার যা কিছু ছিল,
আমি তোমায় ধরে ছিলাম, ভাইয়া কখন আঙুল ছেড়ে দিল!’
মা: ‘এক হাতে ঠিক ধরেছিলাম পুরোনো গাছ ভিটের পূর্বপারে,
গাছটা তখন ঠাঁই দিয়েছে, গাছটা কত সইতে দেখো পারে!’

সন্তান: ‘আমরা তোমায় ধরে ছিলাম, তুমি ছিলে গাছের কাণ্ড ধরে,
এইভাবে আর যায় কি বাঁচা, সমুদ্রজল ফুসছে যখন জোরে!
ভাইয়া ঠিকই পড়ল ঝরে! 
মা গো আমার মা!
এ গাঁও ছেড়ে চল চলে যাই, এইখানে বল থাকবি কেমন করে!
কিন্তু গাছটা সঙ্গে নেব, ভাইয়ার বই, পুতুল গেছে ভেসে,
গাছটা তো ঠিক মায়ের মতো, ঠাঁই দিয়েছে, ওটাই নেব শেষে।
মা: ‘কী যে বলিস বাছা,
শেকড় উপড়ে ফেলা হলে গাছের পক্ষে সম্ভব কি বাঁচা?
গাছটা থাকুক গাছটা বাঁচুক বাঁচাক আমার গাঁ

সন্তান: ‘মা গো আমার মা!
চল চলে যাই দূরের দেশে, গাছটাকে কি সঙ্গে নেব না!’

অশ্রু ঝরে অশ্রু ঝরে অশ্রু কেবল ঝরে মায়ের চোখে
সমুদ্রজল বাড়ছে তাই তো, অশ্রুজলকে সাগর বলে লোকে! 

সুন্দরবন শুধু এই বাচ্চাটাকে বাঁচিয়েছে, তাই নয়, সুন্দরবন বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে চলেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে, আইলা ও সিডরের ক্ষয়ক্ষতি সুন্দরবন নিজের বুকে ধারণ করে বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখে। সুন্দরবন যেন আমাদের আরেক মা, পাখির মা যেমন ডানা মেলে বাচ্চাদের বাঁচায়, তেমনি সুন্দরবন বাঁচিয়ে রাখে আমাদের।


আর আমরা সেই সুন্দরবনকে একটা প্রতিযোগিতায় এত দূর পর্যন্ত এনে ভোট না দিয়ে হেরে যেতে দেব? কক্ষনো না। আর শুনতে পেলাম, মেয়েদের ভোট সুন্দরবনের পক্ষে কম পড়েছে। নারীরা বেশি করে নিজেদের ই-মেইল থেকে ভোট দিন। নারীর নামে নেওয়া সিম থেকে ভোট দিন। বারবার করে ভোট দিন সুন্দরবনকে।


হোক না ওই আয়োজক প্রতিষ্ঠানটা প্রশ্নসাপেক্ষ, সুন্দরবনকে নিয়ে তো আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই। বাংলাদেশকে নিয়ে তো আমাদের ভালোবাসায় কোনো কমতি নেই। আসুন, ভালোবাসি এবং ভোট দিই।
১১ নভেম্বর ২০১১ ভোট দেবার শেষ দিন। SB লিখে পাঠিয়ে দিন ১৬৩৩৩ নম্বরে।

সুত্রঃ প্রথম আলো, ১০ নভেম্বর, ২০১১ 

রবিবার, ৬ নভেম্বর, ২০১১

ধর্ম- ''ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূরীকরণে ইসলাম''

আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির সেরা জীব বা ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হচ্ছে মানবজাতি। প্রকৃতিগতভাবে সব মানুষই এক ও অভিন্ন। তবে অবস্থানগতভাবে কিছুটা পার্থক্য ও বৈষম্য রয়েছে। কিছু উঁচু বংশের, কেউ নিচু বংশের, আবার কেউ ধনী, কেউ দরিদ্র, কেউ চাকর, কেউ মনিব। তবে বংশ-গোত্র, জাতি-বর্ণ ও অবস্থানগত তারতম্য আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বা এর কোনোটিই তাঁর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়। মানবসমাজে ধনী-দরিদ্রের এ ধরনের শ্রেণীভেদ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা আল্লাহর মুখাপেক্ষী; কিন্তু আল্লাহ, তিনি অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।’ (সূরা আল-ফাতির, আয়াত-১৫) 


ইসলাম দুস্থ মানবতা, নিঃস্ব্ব-গরিব কাঙালের স্বার্থ সংরক্ষণের ন্যায়সংগত অধিকার বা হকগুলো ফরজ হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। দান-খয়রাত, সাদকা, জাকাত, উশর, করজে হাসানা, সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা ইত্যাদি ছাড়া দেশের প্রথা ও প্রচলিত রীতিনীতি অনুযায়ী গরিব-দুস্থ, নিঃস্ব-অসহায় কাঙালেরা ধনাঢ্য, বিত্তবান ও অর্থশালীদের অর্থসম্পদ থেকে যে ধরনের আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করতে পারে, তা ইসলামের সম্পদ বণ্টন নীতিমালায় সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে তা যথাযথভাবে আদায়ের জোরালো তাগিদও প্রদান করা হয়েছে। ইসলামি অর্থনীতিতে সর্বপ্রকার ধনসম্পদ বণ্টনের মূলনীতি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘ধনসম্পদ যেন শুধু তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সূরা আল-হাশর, আয়াত-৭) 


ইসলামে মানবসমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য বিশেষভাবে দিকনির্দেশনা রয়েছে। ইসলাম ধনদৌলত, অর্থসম্পদের উদারতা ও আদল-ইনসাফের দ্বারা গরিবের ন্যায্য প্রাপ্য, হতদরিদ্রের হক বা অধিকার ব্যাপকভাবে সংরক্ষিত করেছে। ধনীদের অর্থসম্পদের ওপর যে দরিদ্রের হক রয়েছে, পবিত্র কোরআনে তা বারবারই উচ্চারিত হয়েছে, ‘আর তাদের (ধনী লোকদের) সম্পদে অবশ্যই প্রার্থী (দরিদ্র) ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ (সূরা আল-যারিআত, আয়াত: ১৯)


অন্যদিকে দরিদ্রের স্বাভাবিক জীবনধারণের জন্যও ধনীদের প্রতি তাদের অধিকারকে নির্দিষ্ট করেছে। ইসলামের অর্থনীতিতে জাকাত-ফিতরা, সাদাকা এবং দান-খয়রাত কেবল গরিবদের বেলায় প্রাপ্য, দরিদ্রদের এগুলো হলো মৌলিক অধিকার। ইসলামে জাকাতব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই হলো মানবসেবা তথা হতদরিদ্র মুসলমানদের আর্থসামাজিক জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করা। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সাদাকাত বা জাকাত দরিদ্র, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী কর্মচারী, ইসলামের প্রতি যাদের মন আকৃষ্ট করার প্রয়োজন, বন্দী, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত এবং বিপদগ্রস্ত পথিকের জন্য (ব্যয়িত হবে); এ হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান, আর তিনি মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৬০)
জাকাতের মাধ্যমে সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। ধনীরা তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদের ৪০ ভাগের এক ভাগ বছরান্তে জাকাত প্রদান করে মানবসেবায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। ইসলামি বণ্টনব্যবস্থায় ধনীরা তাদের ধনসম্পদের কিছু অংশ দরিদ্রদের জাকাত দিলে গরিবদের সম্পদ কিছুটা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীভূত হয়। 


পবিত্র কোরআনে ৩২টি আয়াতে সরাসরি জাকাতের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি আয়াতে সালাতের সঙ্গে জাকাত আদায়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। সব মিলিয়ে ৯০টি আয়াতে কারিমায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জাকাত, সাদকা, ফিতরা আর ধনসম্পদ এবং তা ব্যয়ের বিষয়ে আলোচনা এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক হকদারকে তার ন্যায্য অধিকার দিয়ে দাও।’ (বুখারি) নবী করিম (সা.) ফরমান, ‘আমির ও ধনী লোকের ৪০ বছর আগে দরিদ্র বা গরিব লোকেরা জান্নাতে প্রবেশ করবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের জিজ্ঞাসা করবেন, “তোমরা দেখো তো, আমার প্রিয় বান্দাকুল কোথায়?” ফেরেশতারা নিবেদন করবেন, “হে রাব্বুল আলামিন! কারা আপনার প্রিয় বান্দা?” আল্লাহর থেকে উত্তর আসবে, “তারা হবে মুসলমান গরিব-দরিদ্র লোক, আমার দানে ও নিয়ামতে তারা পরিতৃপ্ত এবং সন্তুষ্ট ছিল তাদের জান্নাতে নিয়ে যাও”।’


দরিদ্রের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘দান-খয়রাত এবং বিবিধ রকম সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য ও দায়িত্ব।’ সাহাবায়ে কিরাম নবীজির মুখ-নিঃসৃত বাণী শুনে বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী! যার সামর্থ্য নেই, সেই ব্যক্তি কীভাবে তার কর্তব্য পালন করবে?’ তদুত্তরে তিনি বললেন, ‘শক্তি দিয়ে পরিশ্রম করবে এবং সেই পরিশ্রমলব্ধ অর্থ দ্বারা নিজে উপকৃত হবে এবং গরিব-দুঃখীজনকে অকাতরে দান-খয়রাত করবে।’ সাহাবিগণ আরজ করলেন, ‘যদি এমন কেউ সুযোগ না পায়?’ নবীজি বললেন, ‘যতই তোমাদের কষ্ট হোক, দুঃখ-দুর্দশায় পতিত অভাবগ্রস্ত গরিব-মিসকিনদের সর্বপ্রকার আপদ-বিপদে সাহায্য-সহযোগিতা করবে। অসহায়-উপায়হীন মানুষদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াবে।’ 


মানবজাতি প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ তাআলার অগণিত নিয়ামত উপভোগ করছে, তাই মহান আল্লাহর বান্দা হিসেবে গরিব-অসহায় আর্তমানবতার সেবা, সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও উপকার সাধন করা মুসলমানদের অবশ্যকর্তব্য। দান-খয়রাতের উপযুক্ত পাত্র হলো সমাজের হতদরিদ্র ব্যক্তিরা এবং যে বা যারা আল্লাহ পাকের দ্বীন ইসলামের খেদমতে থেকে সৎপথে জীবন নির্বাহ করছে, তারাই প্রকৃত ঈমানদার।


ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

সুত্রঃ প্রথম আলো, ২১ অক্টোবর, ২০১১


শনিবার, ৫ নভেম্বর, ২০১১

সেরা কল রেকডিং সফটওয়্যার


আসসালামু ওয়ালাইকুম। আশা করি সকলে ভাল আছেন। আজ আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিব চমৎকার একটি সফটওয়্যার এর সাথে। এটি একটি Call recording software. তবে অন্যান্য কল রেকডিং সফটওয়ারের সাথে এর একটি বিশেষ পার্থক্য হল এটি দিয়ে mp3 Formet এ কল রেকর্ড করা যায়। সফটওয়ারের নাম ALON MP3 Dictaphone.



সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
  • সফটওয়ারটি সিম্বিয়ান S60 3rd এবং 5th সংস্করণ সেট সমর্থন করে।
  • অডিও প্লেয়ার MP3, OGG, AAC/MP4/M4A, WMA, AMR, WAV মিউজিক  ফরম্যাট, 3-ব্যান্ড প্যারামেত্রিক ইকুয়ালাইজার, হট কী, M3U playlists, বুকমার্ক, স্লীপ টাইমার এবং অন্যান্য অনেক কিছু সমর্থন করে।
  • কোন রকমের বিরক্তিকর Beeps শব্দ ছাড়াই কল রেকর্ড করে।
  • MP3, AMR এবং WAV ফরম্যাটে কল রেকর্ড হয়।

ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন। সফটওয়্যারটির ফুল ভার্সন দেয়া আছে।

 ভুল হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। সকলে ভাল থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ। 

হজ্ব - '' লাব্বাইক, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক''

আরবি ‘হজ্ব’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নিয়ত করা, কোনো পবিত্র স্থানে গমনের ইচ্ছা পোষণ করা, জিয়ারতের উদ্দেশ্যে প্রতিজ্ঞা করা প্রভৃতি। ইসলামের পরিভাষায় নির্দিষ্ট দিনসমূহে কাবাগৃহ এবং এর সংলগ্ন কয়েকটি সম্মানিত স্থানে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ অনুসারে অবস্থান করা, জিয়ারত করা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করার নামই হজ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে হজের বহুবিধ কল্যাণ ও উপকারিতার বর্ণনা রয়েছে। ইবাদতমূলক দিক থেকে সূরা আল-হজ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। এখানেই ইসলামে হজের বিধানগত মর্যাদা অনুধাবন করা যায়। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, ‘এবং তারা এ প্রাচীন ঘরের (কাবাগৃহ) তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করবে।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত-২৯)। 


মূলত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করাই হজ। আল্লাহর কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণের মুহুর্মুহু ধ্বনিতে ৯ জিলহজ মক্কা মোয়াজ্জমায় সুবিশাল আরাফাতের ময়দান মুখরিত ও প্রকম্পিত করে বিশ্বের লাখ লাখ মুমিন বান্দা পবিত্র হজব্রত পালন করেন। ভাষা, বর্ণ ও লিঙ্গের ভেদাভেদ ভুলে বিশ্বের প্রায় ১৭২টি দেশের ৩৫-৪০ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান প্রতিবছর হজ পালনের লক্ষ্যে মিনা থেকে আরাফাত ময়দানে গমন করেন। তাঁরা পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হতে আত্মশুদ্ধির শপথ ও আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করার পরম সৌভাগ্য অর্জন করে সৃষ্টিকর্তার দরবারে ক্ষমার আবেদন জানান।


হজ বিশ্ব মুসলিমের মিলনস্থল ও ঐক্যের প্রতীক। হজের মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের স্বরূপ প্রকাশ পায়। এ মহামিলন কেন্দ্রে দুনিয়ার সব দেশের, সব অঞ্চলের, সব বংশের, সব বর্ণের, বিভিন্ন ভাষার, আকার-আকৃতির মুসলমান মহান সৃষ্টিকর্তার গভীর প্রেমে ব্যাকুল হয়ে কাফনসদৃশ সাদা পোশাকে সজ্জিত হয়ে একই বৃত্তে, একই কেন্দ্রবিন্দুতে সমবেত হন। মক্কা শরিফ থেকে হজের ইহরাম পরিহিত লাখ লাখ মুসলিম নর-নারী, যুবক ও বৃদ্ধ গভীর ধর্মীয় আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়াননিয়ামাতা লাকা ওয়ালমুল্ক, লা শারিকা লাকা’, অর্থাৎ ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই, আপনার মহান দরবারে হাজির, নিশ্চয়ই সব প্রশংসা, নিয়ামত এবং সব রাজত্ব আপনারই, আপনার কোনো শরিক নেই’—এ হাজিরি তালবিয়া পাঠ করতে করতে হাজিরা মিনাতে এসে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজ আদায় করেন।


বাদ জোহর মিনা থেকে উচ্চ স্বরে তালবিয়া পাঠ করতে করতে আরাফাতের বিশাল প্রান্তরে হাজিরা উপস্থিত হন। জোহরের নামাজের আগে আরাফাত ময়দানের মসজিদে নামিরার মিম্বারে দাঁড়িয়ে হাজিদের উদ্দেশে হজের খুতবা দেওয়া হয়, যাতে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি, বিশ্বশান্তি ও কল্যাণের কথা ব্যক্ত করা হয়। খুতবা শেষে জোহর ও আসরের ওয়াক্তের মধ্যবর্তী সময়ে জোহর ও আসরের কসর নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা হয়। সূর্যাস্তের পূর্বপর্যন্ত সব হাজি আরাফাতের ময়দানেই অবস্থান করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর জিকির-আজকারে মশগুল থাকেন। হজের দিনে সারাক্ষণ আরাফাতে অবস্থান করা ফরজ। হজ পালন তথা এ দিনে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের প্রতিদান হলো, আল্লাহ সেসব হাজি মুমিন বান্দাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করেন।


হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে আল্লাহ তাআলা আরাফার দিনে ফেরেশতামণ্ডলীকে ডেকে বলেন, ‘হে ফেরেশতাগণ! তোমরা লক্ষ করো, আমার বান্দাগণ কী প্রকারে বহু দূর-দূরান্ত থেকে এসে আজ আরাফাত মাঠে ধুলা-বালুর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তোমরা সাক্ষী থাকো, যারা আমার ঘর (কাবা) জিয়ারত করতে এসে এত কষ্ট স্বীকার করছে, নিশ্চয়ই আমি তাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিলাম।’ (বুখারি) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পানি যেমন ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়, হজও তেমন গুনাহসমূহ ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়।’ (বায়হাকি) সঠিকভাবে হজ আদায়কারীকে দেওয়া হয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘বিশুদ্ধ মকবুল একটি হজ পৃথিবী ও এর মধ্যকার সব বস্তু থেকে উত্তম। বেহেশত ব্যতীত আর কোনো কিছুই এর বিনিময় হতে পারে না।’ (বুখারি ও মুসলিম) 


হজ মানুষকে ইসলামের সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ শিক্ষা দেয়। বিশ্বের সব মুসলমান হজের মৌসুমে মক্কা শরিফে একতাবদ্ধ হন এবং কাবাঘর তাওয়াফ, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, সাফা-মারওয়ায় দৌড়ানো ইত্যাদি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন। এতে ঐক্যবোধ জাগরিত হয় এবং সামাজিক জীবনে এর প্রতিফলন দেখা যায়। হজ মানুষের মধ্যে সামাজিক সাম্যবোধ জাগ্রত করে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমান সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সবাই সেলাইবিহীন একই ধরনের সাদা পোশাক শরীরে জড়িয়ে হজ পালন করেন। ফলে তাঁদের মধ্যে যাবতীয় বৈষম্য বিদূরিত হয় এবং সাম্যের অনুপম মহড়ার অনুশীলন হয়। হজ মানুষের মনে-প্রাণে সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।
হজই একমাত্র ইবাদত, যা পালনের সময় দুনিয়ার সব মায়া-মোহাব্বত ছেড়ে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর দিকে ধাবিত হতে হয়। একজন হাজি পার্থিব সব ধন-সম্পদ, স্ত্রী, সন্তানসন্ততি ছেড়ে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে কাবা শরিফ পানে পাড়ি জমান। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ‘তিন ধরনের ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিনিধি বা মেহমান। তাঁরা হলেন—গাজি বা জিহাদ করে যিনি জয়লাভ করেছেন, হজ সম্পাদনকারী এবং উমরা পালনকারী।’


হজ মুসলমানদের মনে সর্ববিষয়ে আল্লাহর আনুগত্যের স্বীকৃতি, হূদয়ের পবিত্রতা, ঈমানের শক্তি বৃদ্ধি ও তাঁদের আধ্যাত্মিক জীবনের চরম উন্নতি সাধনের দ্বারা অন্তরে পারলৌকিক সুখের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। আর সাম্য, মৈত্রী, বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতির সৃষ্টি এবং ভাষা ও বর্ণবৈষম্য ভাবের উৎখাত করে। এতদ্ব্যতীত হজে গিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহখাতাসমূহের জন্য অত্যন্ত বিনয়সহকারে মনের আবেগ মিটিয়ে, অশ্রু বিসর্জন দিয়ে সব অপরাধ ক্ষমা প্রার্থনা ও সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের জন্য দোয়া করে থাকেন এবং বাকি জীবন আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলার জন্য প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে আসেন। তাই হজরত ইমাম আবু হানিফা (র.) পবিত্র হজকে ইসলামের শ্রেষ্ঠতম ইবাদত বলে অভিহিত করেছেন। সুতরাং, যত শিগগির সম্ভব হজ পালনের আগে আমাদের নিয়তের বিশুদ্ধতা প্রয়োজন। হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য ভালোভাবে অবগত হয়ে সামর্থ্যবান মুসলমানদের জীবনে একবার হজ সম্পাদন করা একান্ত আবশ্যক। 


 ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

সুত্রঃ প্রথম আলো, ০৫ নভেম্বর, ২০১১

বুধবার, ২ নভেম্বর, ২০১১

রাজনৈতিক সংস্কৃতি-'' রাজনীতিকেরা কেন জনগণকে বোকা ভাবেন!''

ওপরের শিরোনামটিকে বিষয় করে জাতির কাছে প্রশ্ন তুলেছেন শ্রদ্ধাভাজন সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম তাঁর সম্পাদিত ডেইলি স্টার পত্রিকায়। ওই মন্ত্রব্য প্রতিবেদনে তিনি আমাদের অর্থাৎ জনগণের পক্ষ নিয়ে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, সম্মানীয়া প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেত্রী এমন কিছু বিষয়ে জাতিকে নসিহত করছেন যে, মনে হয় জাতি যেন ঘুমিয়ে আছে, জাতি কিছু জানে না, তাদের যা-ই শোনাবে, তারা তা-ই শুনবে। মাহ্ফুজ আনাম রাজনৈতিক নেতৃত্বের অর্বাচীনতার দুটো উদাহরণ দিয়েছেন। প্রথমটি হলো, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের আপত্তির ব্যাপারে তাঁর মন্তব্য, যেখানে তিনি বলেছেন যে সাকো কোম্পানি (সৈয়দ আবুল হোসেন কোম্পানি) দুর্নীতি করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো, বিরোধী দলের নেত্রীর বিস্ময়কর উক্তি যে আওয়ামী লীগ নাকি মুক্তিযুদ্ধ করেনি, সে মন্তব্যটি। মাহ্ফুজ আনাম বলছেন, যেখানে বিশ্বব্যাংক নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে (যেটা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়েছে) পদ্মা সেতুর সহায়তা বন্ধ রেখেছে এবং এ কারণে এই সরকারের জনগণের কাছে প্রদত্ত অঙ্গীকার ‘পদ্মা সেতু এ সরকারের আমলেই তৈরি হয়ে যাবে’ সেটা পর্যন্ত হুমকির মুখে রয়েছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রী সেটিকে বড় করে না দেখে যোগাযোগমন্ত্রীর ভূমিকাকে সমর্থনের চেষ্টায় আছেন এবং সেটা জনগণকে বোঝাতে চাইছেন, এবং এর থেকে মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী মানুষের প্রাপ্ত তথ্য ও বোধশক্তিকে অবজ্ঞা করছেন।


আর বিরোধী দলের নেত্রীর মন্তব্য তো আরও শিরদাঁড়া কাঁপানো। তিনি সব সময় মনে করেন এবং বলেও থাকেন যে যুদ্ধাপরাধ বলে কিছু হয়নি। এ দেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ও বাঙালির বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দল ও তাদের তাঁবেদার বাহিনী শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীগুলো কোনো যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেনি, এটা হচ্ছে মোটামুটি তাঁর স্থায়ী ধারণা। কিছুদিন আগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এ রকম মন্তব্যও করেছেন যে জনৈক শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধী নেতা কোথায় নির্দিষ্টভাবে খুন বা ধর্ষণ করেছেন, তার সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করতে না পারলে তাঁকে যুদ্ধাপরাধী বলা যাবে না। যুক্তিটা এ রকম যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে নুরেমবার্গ বিচারালয়ে যখন যুদ্ধাপরাধের দায়ে জার্মান সেনাপতিদের বিচার হচ্ছিল, তখন যেন জানতে চাওয়া হচ্ছিল এসব সেনাপতি প্রত্যক্ষভাবে ইহুদি নিধনের জন্য নির্দিষ্টকৃত গ্যাস চেম্বারে গিয়ে গ্যাস উন্মোচনের সুইচটি টিপেছিল কি না! সে যা-ই হোক, বিরোধী দলের নেত্রীর যে কথাটি মাহ্ফুজ আনাম মনে করছেন যে লোকজনকে বোকা ভাবার মওকা, সেটি হচ্ছে আওয়ামী লীগ নাকি মুক্তিযুদ্ধ করেনি। এটা অবশ্য সত্য যে দেশজুড়ে যে লাখ লাখ লোক মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, তারা সবাই আওয়ামী লীগ করত না, কিন্তু তার চেয়েও বড় ঐতিহাসিক সত্য এটি যে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই সমগ্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। বেসামরিক দিক থেকে তো বটেই, সামরিক দিক থেকেও। সত্যিই মানুষকে বোকা ও (বোবা) না ভাবলে এমন মন্তব্য করা সহজ নয়।


মাহ্ফুজ আনাম তাঁর চমৎকার মন্তব্য প্রতিবেদন শেষ করছেন অনেকটা হতাশার ভঙ্গিতে এবং উপায়ান্তর না দেখে ‘যে দেশ যে রকম সে দেশ তেমন নেতা পায়’ প্রবচনের সমর্থনে। তিনি বলছেন, রাজনৈতিক শীর্ষ নেতারা মানুষকে বোকা ভাববেন না কেন। কারণ, তাঁদের যেকোনো জনসভায় লাখ লাখ মানুষ জমায়েত হয়। সেটা ঢাকার কেন্দ্রীয় স্থলে হলেও যা, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল গন্ডামারাতে হলেও তা-ই। কিন্তু কেন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের এত জনসমর্থন দেখা যায়, তারও একটি ব্যাখ্যা মাহ্ফুজ আনাম বা আমরা যাঁরা এ বিষয়ে সমান বিস্ময়বোধ অনুভব করি, আমাদের দেওয়া উচিত।
খুবই সীমিত বোঝার ক্ষমতা দিয়ে আমি এর একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চাই। দেখি, কীভাবে এগোয় কথাটা।


প্রথম যুক্তি হলো, বেকারত্ব: লেখক হুমায়ূন আহমেদ কোথায় যেন লিখেছিলেন যে রাস্তায় কেউ তরমুজ খেলে ষাটজন লোক তা দাঁড়িয়ে দেখে। অর্থাৎ বেকার লোকদের তরমুজ খাওয়া দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। ঠিক সে রকম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের জনসভায় লোকের সমাগম হওয়া ঠিক যে তাঁদের বাচন ও বচন উপভোগ করার জন্য বা তাঁদের সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের কারণে লোকজন হামলে পড়ে তা নয়, কিংবা তাঁদের কথার সমর্থনে তারা জনসভায় যায় তা নয়, তাদের আর কোনো কাজ করার থাকে না বলে তারা জনসভায় যায়। আর এরপর যদি টাকা দিয়ে লোক আনার ব্যবস্থা থাকে জনসভায়, তাহলে তো বেকার লোকদের আয়েরও রাস্তা খোলে।


দ্বিতীয় যুক্তি হলো ব্যক্তিপূজা: আমার এক বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিকমনা ছাত্র পরবর্তী জীবনে দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে। এ পর্যায়ে তার সঙ্গে একবার আমার দূরের কোনো ভ্রমণে দেখা হয়। কথাবার্তার একসময় তার নেত্রীর প্রসঙ্গে কিছু বলতে গিয়ে লক্ষ করলাম সে কোনো সময় নেত্রীর নাম বলছিল না, বলছিল বিশেষণসহকারে নেত্রীর পদবিগুলো। আমার আরেক ছাত্র, সেও বুদ্ধিদীপ্ত, পরবর্তী জীবনে উত্তরাধিকারসূত্রে গদিনশিন পীর হয়। তার বিয়ের দাওয়াত পেয়ে গেলাম এবং পরবর্তী সময়ে তার বউভাতের দাওয়াতে গেলাম পীরের আস্তানায়। একপর্যায়ে স্থানীয় একজন লোকের কাছে কী প্রসঙ্গে আমার ছাত্রের নাম উল্লেখ করলে, ওই লোক আমাকে শুধরে দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পীর সাহেবের সব বিশেষণযুক্ত শব্দ উচ্চারণ করে তারপর থামল। আমার প্রথম ছাত্রের আচরণ এবং দ্বিতীয় ছাত্রের শিষ্যের আচরণের মধ্যে যদি কোনো পার্থক্য না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সমাজের সংকট খুব গভীরে। সংসদে সাংসদেরা যখন ভাষণ দেন, তখন গুনে দেখবেন কতবার তাঁরা নিছক প্রয়োজনবিহীনভাবে তাঁদের নেত্রীদের স্তুতি করে থাকেন।


ব্যক্তিপূজা বা কাল্টিজম সব সমাজে কমবেশি আছে, কিন্তু আমাদের সমাজে এটি একটি মারাত্মক ব্যাধির মতো এবং কেন এটা তা-ই, তার কারণ হচ্ছে জ্ঞানের রাস্তা খোঁজার ব্যাপারে আমাদের সীমাবদ্ধতা। যে সমাজে বলা হচ্ছে এর বাইরে তুমি চিন্তা করতে পারবে না, এর বাইরে তুমি প্রশ্ন করতে পারবে না কিংবা অমুক বিষয়ে বহু আগেই সমাধান দেওয়া আছে, সে সমাজে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে এবং রাজনৈতিক পথ খোঁজার ক্ষেত্রে যে অনিবার্য পতনশীলতা আসে, সেটাকে ঢাকা দিতে দুটো পথ তৈরি হয়—একটি হচ্ছে ব্যক্তিপূজা, আরেকটি হচ্ছে সম্মোহিত বা মিস্টিফাইড থাকা এবং চিন্তা করে দেখলে, এ দুটো কাজই খুব সহজ পন্থার কাজ।


আমার এক সহকর্মী রসিক ছিলেন। তিনি আরেকজন জাতীয়ভাবে পরিচিত সহকর্মীকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। এবং শিক্ষকদের সভা-সমিতিতে প্রথম সহকর্মী দ্বিতীয় সহকর্মীকে উদ্দেশ করে বলতেন, অমুক যা বলেন, আমার কথাও তা-ই। বড় দলগুলোর রাজনৈতিক চর্চায় দেখি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ভার নেত্রীর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। এগুলো হচ্ছে সহজ পন্থা। আপনার চিন্তাটা আরেকজন করে নিল। একটি দেশের বেশির ভাগ লোক যখন সহজ কাজগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নবিহীন করতে থাকে, তখন সে সমাজ এগোয় না। পাঠাগার ছেড়ে, গবেষণাগার ছেড়ে, সাধনা ছেড়ে, বিজ্ঞান ছেড়ে, স্বাস্থ্য ছেড়ে, সংসদ ছেড়ে এবং অর্থনৈতিক উৎপাদন ছেড়ে সবাই যদি রাস্তায় তোরণ তৈরি, জনসভায় হুংকার দেওয়া, আধ্যাত্মিকতা চর্চার নামে অলস জীবন যাপন করা কিংবা অযাচিতভাবে বিদেশ ভ্রমণের পাঁয়তারা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাহলে পদ্মা সেতু দিল্লি দুরস্ত হয়ে যাবে বৈকি।


আরেকটা জিনিস সাধারণভাবে জনগণকে অন্ধ করে রাখতে সাহায্য করে, সেটা হলো সম্মোহিত হয়ে থাকা। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ধর্মচর্চায় যেসব দেশ মানবতার উদ্বোধনে উন্নতি লাভ করেছে, সেসব দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায়, সেখানে জ্ঞান-সাধনার চর্চায় এবং ধর্মের তাত্ত্বিক অনুশীলনে একটি শক্তিশালী অসম্মোহিত হওয়ার প্রচেষ্টা তৈরি হয়েছিল। অসম্মোহিত বা ডিমিস্টিফাইড হওয়ার প্রক্রিয়া যদি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর দ্বারা উদ্বোধিত না হয়, তাহলে কিন্তু জাতি দিকনির্দেশনা পাবে না। বিতর্ক থাকতে হবে, বিতর্ক সহ্য করতে হবে, পুরোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হবে, নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি হবে, নতুন প্রশ্নের অবসান হবে, তখন আরও নতুন প্রশ্ন উঠে আসবে। সমাজে জঙ্গম পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর সদস্যরাই।


আমাদের সমাজে ডিমিস্টিফিকেশনের খুব অভাব হয়েছে জীবন যাপনে এবং জীবনচিন্তায়। এ অভাবের সুযোগ নিচ্ছে সহজপন্থী রাজনৈতিক নেতারা ব্যক্তিপূজার শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করে এবং জনগণকে সহজ পথের ধোঁকা দিয়ে। জনগণও সহজ পথটা খোঁজে এবং ভালোবাসে; কেননা তাদের চোখের সামনে কঠিন পথের অভিযাত্রী নেই।


ড. মোহীত উল আলম, বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি, ইউল্যাব, ঢাকা।
mohit_13_1952@yahoo.com




সুত্রঃ প্রথম আলো, ০২ নভেম্বর, ২০১১