পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

শুক্রবার, ২১ অক্টোবর, ২০১১

একজন যোগাযোগমন্ত্রী এবং পদ্মা সেতুর ভবিষ্যৎ

এই লেখাটির বিষয় ভারাক্রান্ত মনের এক বঙ্গসন্তানের দীর্ঘশ্বাস এবং পদ্মাপাড়ের ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার অপমৃত্যুতে কাতর এক নাগরিকের দীর্ঘ হতাশা। এক সপ্তাহ ধরে পত্রপত্রিকাসহ গণমাধ্যমে যে খবরটি খুব উচ্চ স্বরে প্রকাশিত হচ্ছে, তা হলো—বিশ্বব্যাংক, পদ্মা সেতু ও যোগাযোগমন্ত্রীর দুর্নীতি। এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন যে বিশ্বব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠান যুক্তি-প্রমাণ ছাড়া পদ্মা সেতুর বিষয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তুলবে সরকারের মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। সরকার এ বিষয়ে কোনো জোরালো প্রতিবাদ তো জানায়নি, এমনকি তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি প্রদানে সময়োপযোগী ব্যবস্থা নিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। এ বিষয়ে মন্ত্রীকে সংবাদকর্মীরা পদত্যাগ করবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি হেসে হেসে চমৎকার উত্তর দিয়েছেন, ‘আমার অপসারণ আমার হাতে নেই।’


মাননীয় মন্ত্রী, আপনাকে আমরা ধন্যবাদ জানাতে চাই। কারণ, আপনি সত্যি ধন্যবাদের যোগ্য। আপনি অন্তত এই একটি ক্ষেত্রে সত্য কথা বলেছেন। আপনাকে আমরা ধন্যবাদ দিতে চাই এ জন্য যে আপনি সত্যি আপনার দলের প্রতি এবং দলের প্রধানের প্রতি অসীম আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। আপনার এই বক্তব্য থেকে এও স্পষ্ট যে দল বা সরকার চাইলে আপনি পদত্যাগ করবেন। দল বা সরকার চাইছে না, তাই...। দলের প্রতি আপনার অসীম এই আনুগত্যের কারণে ভবিষ্যতে আপনার আরেকবার মন্ত্রী হওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা যে রয়েছে, সে বিষয়ে আমাদের সন্দেহ নেই। এর আগেও আমরা আপনাকে দেখেছি, দামি একটা গাড়িতে চড়ে সারা দেশের ছিন্নভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে হাত নেড়ে টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের মতো হাসি ছড়িয়ে ‘রোদ হলে ঈদের আগে সব ঠিক হয়ে যাবে’ বাণী দিয়েছেন টিভিতে। যেখানে ঈদের আগে ট্রেনের টিকিটের জন্য কমলাপুর স্টেশনে মানুষ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হচ্ছে, বাস-লঞ্চযাত্রীরা বেশি পয়সা দিয়েও হয়রানির শিকার হচ্ছে; প্রতিদিন টিভি চ্যানেলগুলো এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেখাচ্ছে। আর আপনি আকস্মিক কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে টিভি ক্যামেরার সামনে চমৎকার সাফারি পরে বললেন, ‘দেখলেন, কোনো অভিযোগ নেই।’ কাজেই মাননীয় মন্ত্রী, আপনাকে আমরা ধন্যবাদ জানাতে চাই। সে সময়ে আপনার এই অসাধারণ নির্বিকারত্ব দেখে লজ্জায়-ক্ষোভে-অভিমানে আমরা আপনাকে ধন্যবাদ জানানো ছাড়া আর কীই-বা করতে পারতাম।
মাননীয় মন্ত্রী, আপনাকে ধন্যবাদ জানানো উচিত। কারণ, আপনিই এ দেশের ইতিহাসে প্রথম মন্ত্রী, যিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে দুর্নীতি করেননি—এ মর্মে সনদ চেয়েছেন। দুদক অবশ্য আপনার ডাকে সাড়া না দিয়ে পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের তোলা আপনার দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তদন্তে নেমেছে এবং প্রমাণ পেলে তারা ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছে।
আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে জনগণের সেবক বলা হলেও বাস্তবে সরকার হচ্ছে শাসক। আমরা বুঝি না, সেই সরকারের কানে কত তুলা দেওয়া থাকলে তার ঘুম ভাঙাতে কতটুকু চিৎকার করতে হবে? কিছুতেই জনগণ তার দাবি-অনুযোগ-অনুরোধ সরকারের কাছে পৌঁছাতে পারে না। কাগজে-কলমে সরকার তা শোনার জন্য কান পেতে থাকলেও সেই কানে আছে ভারী মোটা তুলা। সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যুর পর দেশের প্রায় সব সড়কের অবস্থা বেহাল দেখে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠলে (এমনকি মহান সংসদেও) তখনো সরকারের ঘুম ভাঙেনি। সেদিন আপনি পদত্যাগ করলে আপনার দল ও সরকারের সম্মান তো বটেই, পদ্মা সেতুও রক্ষা পেত। অথচ আপনার বা আপনাদের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে আজ পদ্মা সেতুর ভাগ্যও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আপনারা রাজনীতিবিদ এবং জনদরদি মানুষ; তার ওপর মন্ত্রী। আপনারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর (অথবা তাঁর কাছের) স্নেহসিক্ত। মহান সংসদে যখন আপনার পদত্যাগের দাবি ওঠে, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাদের ছায়া দেন। মাননীয় মন্ত্রী, আপনার নিশ্চয়ই অনেক ভালো গুণ এবং যোগ্যতা আছে (না হলে আপনি একজন সফল ব্যবসায়ী হলেন কীভাবে?), সেগুলো নির্ধারিত স্থানে প্রয়োগ করলেই ভালো হয়। জনগণের দুর্ভোগ ও ক্ষোভ বাড়িয়ে সরকারের জনপ্রিয়তা নষ্ট করে কানে তুলা দিয়ে আপনি যে নিজেকে ক্রমাগত ‘মিস্টার ক্লিন’ প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, এর ফলে ক্ষতি হচ্ছে কার—তা কি একবার ভেবে দেখেছেন? এ দেশের এবং দেশের জনগণের। একজন দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে আপনার কি তা করা উচিত?
এই তো দু-তিন দিন আগে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাঁর এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ করার অভিযোগের কারণে পদত্যাগ করলেন (কিছুদিন আগে জাপানের প্রধানমন্ত্রীও পদত্যাগ করলেন)। এসব ঘটনা কি আপনার বা আপনার সরকারের চোখে পড়ে না। গত তিন বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জনও তো কম নয় (বিরোধী দল যত নিন্দাই করুক)। কিন্তু এসব অর্জন আজ যায় যায় অবস্থা। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং তার সরকারের সুনাম ও স্বচ্ছতার স্বার্থে আপনাকে পদত্যাগপত্র দিতে বললে এই রাষ্ট্র বা আপনার কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে?
ধরে নিলাম, রাষ্ট্রের কোথাও ছোটখাটো কিছু একটা হলেই এ দেশের সুশীল সমাজ (বিশ্বব্যাংক সুশীল সমাজের পদভুক্ত কি না, তা প্রমাণের জন্য তদন্ত কমিটি করা প্রয়োজন) গলাবাজি করে মিডিয়া ও মানুষের মাথা খারাপ করে তোলে এবং সে ধরনের লঘু পাপের জন্য তারা গুরুদণ্ড দিয়ে আপনাকে বিদায় করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। যদি তা-ও হয় এবং আপনার এ পদত্যাগের কারণে পদ্মা সেতুর সম্ভাবনার স্বপ্ন আমরা ষোলো কোটি মানুষ দেখতে পারি, তাহলেও কি এটুকু ত্যাগ আপনি করতে পারেন না?
সৌরভ সিকদার: লেখক, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
jeweel1965@gmail.com

সুত্রঃ প্রথম আলো, ২১ অক্টোবর, ২০১১

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন