পৃষ্ঠাসমূহ

তারিখ

শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১১

এ কথা একজন মন্ত্রী বলতে পারেন?






আনিসুল হক | তারিখ: ১৭-০৯-২০১১
  • মজিবুর রহমান ফকির
    মজিবুর রহমান ফকির
1 2
এমন কথা কেউ বলতে পারেন! এমন কথা একজন মন্ত্রী বলতে পারেন? তা-ও আবার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী? মজিবুর রহমান ফকির নামের এই প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ধর্মমতে মুসলমানদের কোনো অকালমৃত্যু নেই। তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর তাদের জন্য নির্ধারিত সময়েই মারা গেছে। তাদের জন্য দুঃখ লাগতে পারে। তবে এটাই বাস্তব।’
একজন মন্ত্রীর মানসিকতা, যুক্তি-শৃঙ্খলা এ রকম হয় কী করে? তাহলে তো খুনি খুন করে বলবে, আল্লাহ তাঁর হায়াত তুলে নিয়েছেন বলে উনি মারা গেছেন, আপনারা বিচার করার কে? বিচার করবেন আল্লাহ তাআলা। তাহলে আর হাসপাতাল দরকার কেন, কারণ স্বাস্থ্য দেন আল্লাহ, মৃত্যুও দেন তিনি। তাহলে আর এমডিজিতে শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ কেন? জন্ম দেবেন আল্লাহ, মারবেনও তিনি। আমরা কেবল আমাদের মাতৃমৃত্যুর হার বেশি বলে দুঃখ পেতে পারি, কিন্তু এ নিয়ে আমাদের করার কিছু নেই।
অথচ আমাদের ধর্মেরই ঘোষণা, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন করবেন না, যতক্ষণ না নিজেরাই নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করে।’ এই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব স্বাস্থ্য আর পরিবারকল্যাণের, আর তিনি ‘বাংলাদেশে জনসংখ্যানীতি যুগোপ-যোগীকরণ জাতীয় কর্মশালা’য় বলে বসেন, ‘মা-বাবা শিক্ষিত হলে সন্তান বেশি হলে সমস্যা নেই। তিনি তাঁর মা-বাবার নবম সন্তান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর মা-বাবার নবম সন্তান ছিলেন!’ (প্রথম আলো, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১১)। যে দেশে জনসংখ্যা এক নম্বর সমস্যা, সেই দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী যদি ঘরে ঘরে রবীন্দ্রনাথের জন্ম দেওয়ার জন্য নয়টা, দশটা, চৌদ্দটা সন্তান জন্ম দেওয়ানোর জন্য নসিহত করতে থাকেন, তাহলে নিজের চোখ-কানকে বিশ্বাস করব, নাকি ভাবব, আমরা উন্মাদাশ্রমে বসবাস করছি। বাবার কোলে থাকা শিশু হঠা ৎ ছুটে আসা গুলিতে মারা যাওয়ার পর তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন।’ পরিশেষে তাঁকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ আবার কোন আল্লাহর মালের পাল্লায় আমরা পড়লাম।
এদিকে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান আবার বিশেষ আগ্রহ ভরে খোঁজ নিয়েছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ড্রাইভার কী পাস? গত বৃহস্পতিবার মাদারীপুরে জেলা প্রশাসকের কক্ষে সড়ক নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গাড়িচালককে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কী পাস? সে বলল, “আমি তো স্যার ফাইভ পাস।” সেও প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি ভালোভাবে চালায়।’
এখন আমাদের নৌপরিবহনমন্ত্রীকে জেরা করে বেড়াতে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ড্রাইভারকে। যোগাযোগমন্ত্রীর সততা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত, এখন দাতারা ভরসা করতে পারছে না যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ওপর। কারণ, দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে, কানাডা সরকার তদন্তে নেমেছে। গতকালের প্রথম আলোরই খবর, পদ্মা সেতু নির্মাণে দুর্নীতি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, আর পরীক্ষা ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স না দিয়ে বিধিবিধান মেনে পরীক্ষা করিয়েই ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থানকে সমর্থন করি। অবশ্য তাঁর মন্ত্রীদের কথা সঠিক ধরে নিলে প্রধানমন্ত্রীই ভুল নির্দেশ দিয়েছেন। কে কবে মারা যাবে, যেহেতু তা পূর্বনির্ধারিত, কাজেই অশিক্ষিত-অদক্ষ ড্রাইভারের হাতেও গাড়ি চালানোর অধিকার দেওয়া যায়। আল্লাহ না চাইলে তো আর দুর্ঘটনা ঘটবে না, কেউ মরবেও না। আর আমাদের আইন-আদালত, জেলখানা ইত্যাদিও তুলে দেওয়া দরকার।
মিশুক মুনীরের মৃত্যু কেবল পূর্বনির্ধারিত ছিল, তা-ই নয়; তার পিতা শহীদ নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর মৃত্যুও পূর্বনির্ধারিত ছিল। কাজেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেরও কোনো দরকার নেই।
মিশুক মুনীর, আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন। তারেক মাসুদ, আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন। আপনাদের মৃত্যুর পরে, সেই মৃত্যু নিয়ে আমাদের এত কথা বলতে হচ্ছে, এত কথা শুনতে হচ্ছে। আমরা সত্যি একটা অভাগা জাতি। আমরা অভাগা বলেই এ ধরনের মন্ত্রী আমরা পেয়েছি।
একটা গাড়ির চালক যদি অদক্ষ হয়, অযোগ্য হয়, অবিমৃষ্যকারী হয়, কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়—তা ওই গাড়ির যাত্রী, পথিক, অন্য গাড়ির চালক, এমনকি পথপার্শ্ববর্তী দোকানপাটের মানুষজনের জন্য সমূহ বিপদের কারণ হতে পারে। কিন্তু মন্ত্রণালয় চালানোর ভার যদি এ ধরনের অদৃষ্টবাদী কিংবা কোটারি স্বার্থের প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তার পরিণতি কী হবে? তখন আমাদের আর অদৃষ্টবাদী না হয়ে উপায় থাকে না; তখন শুধু আমরা এই প্রার্থনাই করতে পারি—হে আল্লাহ, এই ধরনের দেশচালকদের হাত থেকে আমাদের মন্ত্রণালয়গুলোকে, আমাদের দেশের বর্তমান ও ভবিষ্য ৎকে তুমি রক্ষা করো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার মূল্যবান মতামত প্রদান করুন